ভারতের বৈদেশিক মুদ্রা ভান্ডার নিয়ে (India dollar reserves) সাম্প্রতিক তথ্য নতুন করে আলোচনা উসকে দিয়েছে। ২০২৫ সালের শেষভাগে ভারতের হাতে থাকা মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের পরিমাণ নেমে এসেছে প্রায় ১৭৪ বিলিয়ন ডলারে, যা ২০২০ সালের পর সর্বনিম্ন। ২০২৩ সালের সর্বোচ্চ স্তর থেকে এই পতন প্রায় ২৬ শতাংশ। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে-এটা কি ভারতের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ, নাকি ভবিষ্যতের ঝুঁকি সামলাতে এক সচেতন কৌশল?
কেন কমছে ডলারের সঞ্চয়
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের মূল কারণ রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI)-এর সম্পদ পুনর্বিন্যাস। এতদিন বৈদেশিক মুদ্রা ভান্ডারের বড় অংশই ছিল মার্কিন ডলারভিত্তিক সম্পদে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ডলারের অস্থিরতা, সুদের হারের ওঠানামা এবং ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে RBI ঝুঁকি কমাতে চাইছে।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনের পর সম্ভাব্য নতুন শুল্কনীতি ও বাণিজ্যিক কড়াকড়ির আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক ডলারের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে অন্য সম্পদের দিকে ঝুঁকছে।
সোনার দিকে ঝোঁক বাড়ছে
ডলার কমানোর পাশাপাশি সোনার ভাণ্ডার বাড়ানোই এখন RBI-এর বড় পদক্ষেপ। ২০২৫ সালে ভারতের সোনার মজুত প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়ে ৮৭৬ টনে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনাকে দীর্ঘদিন ধরেই “সেফ হ্যাভেন” বা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়। ডলার বা অন্য মুদ্রার মতো এটি কোনও একটি দেশের অর্থনৈতিক নীতির উপর সরাসরি নির্ভরশীল নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক অস্থিরতা, যুদ্ধ পরিস্থিতি ও নিষেধাজ্ঞার যুগে সোনার ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। RBI সেই বাস্তবতা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ডি-ডলারাইজেশন কি তবে শুরু?
অনেকে মনে করছেন, ভারতের এই পদক্ষেপ কি তবে ডি-ডলারাইজেশন বা ডলার নির্ভরতা কমানোর স্পষ্ট ইঙ্গিত? অর্থনীতিবিদদের বড় অংশের মতে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। ভারত এখনও ডলারকে পুরোপুরি এড়িয়ে যাচ্ছে না। বরং এটি একটি সতর্ক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কৌশল।
বর্তমানে ভারতের মোট বৈদেশিক মুদ্রা ভান্ডার প্রায় ৬৫০ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে এখনও প্রায় ৫৮ শতাংশ সম্পদ ডলারভিত্তিক। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিশেষ করে তেল আমদানি ও বৈশ্বিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ডলারের ব্যবহার অপরিহার্য। তাই ডলার ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্নই নেই-শুধু ভারসাম্য আনার চেষ্টা চলছে।
রুপির স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা
ডলার ও সোনার মধ্যে ভারসাম্য রেখে RBI মূলত রুপির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চাইছে। ডলার অতিরিক্ত শক্তিশালী হলে রুপির উপর চাপ বাড়ে, আমদানি খরচ বেড়ে যায় এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হয়। আবার ডলার দুর্বল হলে রপ্তানিকারকদের উপর প্রভাব পড়ে। এই দ্বিমুখী চাপ সামলাতেই বৈদেশিক মুদ্রা ভান্ডারের গঠন বদলানো হচ্ছে।
আশা না উদ্বেগ-কোন পথে?
এই প্রেক্ষিতে প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া কঠিন। একদিকে ডলারের সঞ্চয় কমা শুনে সাধারণ মানুষের মনে উদ্বেগ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু অন্যদিকে, এটি যদি পরিকল্পিত ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে তা ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের বর্তমান অবস্থান মাল্টিপোলার বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি। একাধিক মুদ্রা ও সম্পদের উপর ভর করে এগোনোর এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল করতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ভারতের মার্কিন ডলারের সঞ্চয় কমা কোনও হঠকারী সিদ্ধান্ত নয়। এটি উদ্বেগের চেয়ে বেশি সতর্কতা ও কৌশলগত চিন্তার প্রতিফলন। ভবিষ্যতে এই নীতির ফল কী হবে, তা সময়ই বলবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে RBI যে চোখ বুজে ঝুঁকি নিচ্ছে না, বরং হিসেব কষেই এগোচ্ছে-এটাই সবচেয়ে বড় ভরসা।
