ভারত-সৌদি বৈঠকে পরমাণু শক্তি নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত

নয়াদিল্লিতে ১৯ জানুয়ারি ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (India Saudi) মধ্যে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফলপ্রসূ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও ইউএই…

india-saudi-meeting-nuclear-energy-decision

নয়াদিল্লিতে ১৯ জানুয়ারি ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (India Saudi) মধ্যে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফলপ্রসূ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও ইউএই প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের মধ্যে এই বৈঠকটি সময়ের হিসেবে মাত্র তিন ঘণ্টার হলেও, এর তাৎপর্য ছিল বহুমাত্রিক ও সুদূরপ্রসারী।

Advertisements

এই বৈঠকের অন্যতম বড় সিদ্ধান্ত হল দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আগামী ২০৩২ সালের মধ্যে দ্বিগুণ করে ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ। বর্তমানে ভারত ও ইউএই-এর মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২২ সালে স্বাক্ষরিত কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (CEPA)-এর প্রত্যক্ষ ফল।

   

ISI র বিস্ফোরণে কাবুলের চাইনিজ রেস্তোরাঁয় মৃত্যূলীলা

এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য পূরণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সংস্থাগুলিকে (MSME) আরও বেশি করে যুক্ত করা, নতুন বাজার উন্মোচন এবং ভারত মার্ট ও ভার্চুয়াল ট্রেড করিডরের মতো উদ্যোগগুলিকে সক্রিয়ভাবে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

সবচেয়ে আলোচিত ও তাৎপর্যপূর্ণ দিকগুলির মধ্যে অন্যতম হল পরমাণু শক্তি ক্ষেত্রে সহযোগিতা। ভারতের SHANTI আইন ২০২৫ কার্যকর হওয়ার পর উন্নত পরমাণু প্রযুক্তিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ অনেকটাই বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারত ও ইউএই যৌথভাবে বড় আকারের পরমাণু রিঅ্যাক্টর এবং স্মল মডুলার রিঅ্যাক্টর (SMR) উন্নয়ন ও স্থাপনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

পাশাপাশি আধুনিক রিঅ্যাক্টর ব্যবস্থা, পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরমাণু নিরাপত্তা ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়বে। এর ফলে ভারতের শক্তি নিরাপত্তা যেমন মজবুত হবে, তেমনই পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বড়সড় সুবিধা মিলবে।

শক্তি সহযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) সরবরাহ সংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি। এই বৈঠকে HPCL এবং ADNOC Gas-এর মধ্যে একটি ১০ বছরের LNG সরবরাহ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৮ সাল থেকে প্রতি বছর ০.৫ মিলিয়ন টন LNG ভারতকে সরবরাহ করবে ইউএই।

প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও ভারত-ইউএই সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছতে চলেছে। দুই দেশ একটি কৌশলগত প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব কাঠামো গড়ে তুলতে ‘লেটার অফ ইনটেন্ট’ স্বাক্ষর করেছে। এই অংশীদারিত্বের আওতায় প্রতিরক্ষা শিল্প, উন্নত প্রযুক্তি, সাইবার সুরক্ষা, সন্ত্রাসবাদ দমন, যৌথ প্রশিক্ষণ এবং সামরিক বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়ে সহযোগিতা হবে। বিশেষ করে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যৌথ লড়াইয়ে এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।

এছাড়াও গুজরাটের ধোলেরা স্পেশাল ইনভেস্টমেন্ট রিজিয়নে ইউএই-এর বিনিয়োগ, মহাকাশ গবেষণায় সহযোগিতা, সুপারকম্পিউটিং ক্ষেত্রে G42-এর সঙ্গে যৌথ কাজ, ডিজিটাল ডেটা এম্বাসি স্থাপন এবং আবুধাবিতে ‘হাউস অফ ইন্ডিয়া’ গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী মোদী ইউএই-এর সার্বভৌম ওয়েলথ ফান্ডগুলিকে ২০২৬ সালে চালু হতে চলা দ্বিতীয় ন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ডে (NIIF) অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

এই বৈঠক ভারত ও ইউএই-এর মধ্যে বিদ্যমান কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপকে আরও গভীর ও শক্তিশালী করেছে। প্রেসিডেন্ট আল নাহিয়ানের এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত ফলপ্রসূ সফরে দুই দেশের নেতৃত্বের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও ব্যক্তিগত উষ্ণতার প্রতিফলন স্পষ্ট। ইউএই ভারতের ব্রিকস চেয়ারম্যানশিপকে সমর্থন জানিয়েছে এবং ফেব্রুয়ারিতে ভারতে অনুষ্ঠিতব্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) শীর্ষ সম্মেলনে উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিত্বের কথাও নিশ্চিত হয়েছে।

এই সিদ্ধান্তগুলি ভারতের শক্তি রূপান্তর, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ইউএই-তে বর্তমানে ৩০ লক্ষেরও বেশি ভারতীয় প্রবাসী বসবাস করেন, যা এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি দৃঢ় মানবিক ভিত্তি তৈরি করেছে। ‘

এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত লক্ষ্যগুলি কত দ্রুত বাস্তবে রূপ পায়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট ভারত ও ইউএই-এর সম্পর্ক এখন শুধুমাত্র বাণিজ্যের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়, বরং একটি নতুন কৌশলগত অংশীদারিত্বের যুগে প্রবেশ করেছে।

Advertisements