ভারতের ধনীদের তালিকায় নেই আম্বানি-আদানি-টাটা!

ভারতের ধনীদের কথা উঠলেই সাধারণত যে নামগুলি প্রথমে মাথায় আসে, সেগুলি হল আম্বানি, আদানি কিংবা টাটা। দেশের কর্পোরেট দুনিয়ায় এই পরিবারগুলির প্রভাব, সম্পদ ও পরিচিতি…

india-richest-surnames-list-no-ambani-adani-tata-hurun

ভারতের ধনীদের কথা উঠলেই সাধারণত যে নামগুলি প্রথমে মাথায় আসে, সেগুলি হল আম্বানি, আদানি কিংবা টাটা। দেশের কর্পোরেট দুনিয়ায় এই পরিবারগুলির প্রভাব, সম্পদ ও পরিচিতি এতটাই ব্যাপক যে অনেকের কাছেই মনে হয়—ভারতের ধনীদের তালিকা মানেই এই কয়েকটি বড় নাম। কিন্তু সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা সেই ধারণায় বড়সড় ধাক্কা দিল। হুরুন ইন্ডিয়া (Hurun India) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ভারতের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত উপাধি বা পদবি-র তালিকায় আম্বানি, আদানি কিংবা টাটার নামই নেই।

Advertisements

হুরুন ইন্ডিয়ার এই সমীক্ষায় মূলত দেশের শীর্ষ ধনীদের পদবি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ভারতের ধনীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় যে পদবিগুলি রয়েছে, সেগুলি হল—

   

১) আগরওয়াল (Agrawal)
২) গুপ্ত (Gupta)
৩) প্যাটেল (Patel)
৪) জৈন (Jain)
৫) মেহতা (Mehta)
৬) গোয়েঙ্কা (Goenka)
৭) শাহ (Shah)
৮) সিং (Singh)
৯) রাও (Rao)
১০) দোশি (Doshi)

এই তালিকা থেকেই স্পষ্ট, ভারতের ধনীদের বড় অংশই কোনও একটি নির্দিষ্ট কর্পোরেট পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নন। বরং বিভিন্ন সম্প্রদায়, অঞ্চল এবং পেশাগত পটভূমি থেকে উঠে আসা ব্যবসায়ীরা আজ দেশের সম্পদশালী শ্রেণিকে প্রতিনিধিত্ব করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগরওয়াল, গুপ্ত, জৈন কিংবা গোয়েঙ্কা—এই পদবিগুলি দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের ব্যবসায়িক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। মারোয়াড়ি ও জৈন সম্প্রদায়ের বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। ছোট ব্যবসা থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে বড় শিল্পগোষ্ঠী গড়ে তোলার এক দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে এই সম্প্রদায়গুলির মধ্যে। ফলে হুরুনের তালিকায় এই পদবিগুলির আধিক্য বিশেষভাবে নজর কেড়েছে।

অন্যদিকে, প্যাটেল ও শাহ পদবি মূলত গুজরাত-কেন্দ্রিক ব্যবসায়ীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। গুজরাত দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের শিল্প ও বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। টেক্সটাইল, ডায়মন্ড, কেমিক্যাল, ফার্মাসিউটিক্যালস থেকে শুরু করে আধুনিক স্টার্টআপ—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই গুজরাতি ব্যবসায়ীদের দাপট রয়েছে। সেই কারণেই প্যাটেল ও শাহ পদবির এতজন ধনী এই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

তালিকায় সিং ও রাও পদবির উপস্থিতি আবার অন্য একটি দিক নির্দেশ করে। এই পদবিগুলি উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত। এর থেকে বোঝা যায়, আজকের দিনে ভারতের সম্পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া আর শুধুমাত্র কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। আইটি, অবকাঠামো, ম্যানুফ্যাকচারিং, ফিনান্স, রিয়েল এস্টেট এবং নতুন প্রজন্মের স্টার্টআপ—সব ক্ষেত্র থেকেই নতুন নতুন ধনকুবের উঠে আসছেন।

সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হল, দেশের সবচেয়ে পরিচিত ও আলোচিত শিল্পপতি পরিবার—আম্বানি, আদানি কিংবা টাটা—এই ‘সবচেয়ে সাধারণ পদবি’র তালিকায় নেই। এর অর্থ এই নয় যে তাঁরা ধনী নন বা তাঁদের প্রভাব কম। বরং এর মানে হল, এই পরিবারগুলি সংখ্যায় খুবই সীমিত এবং ব্যতিক্রমী। তাঁদের সম্পদের পরিমাণ বিপুল হলেও, সংখ্যাগত দিক থেকে তাঁরা ভারতের ধনীদের ভিড়ে সংখ্যালঘু।

হুরুন ইন্ডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী, এই তথ্য ভারতের অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। তা হল—দেশে সম্পদ সৃষ্টির ক্ষেত্রটি ক্রমশ আরও বিস্তৃত ও বহুমুখী হয়ে উঠছে। কয়েকটি বড় নামের বাইরে অসংখ্য মাঝারি ও বড় ব্যবসায়ী পরিবার ধীরে ধীরে বিপুল সম্পদের মালিক হচ্ছেন, যাঁদের নাম হয়তো জাতীয় সংবাদমাধ্যমে ততটা আলোচিত নয়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ভারতের ধনীদের তালিকা শুধু আম্বানি-আদানি-টাটায় সীমাবদ্ধ নয়। বরং আগরওয়াল, গুপ্ত, প্যাটেল, জৈন, মেহতা, গোয়েঙ্কা, শাহ, সিং, রাও ও দোশির মতো পদবিগুলি প্রমাণ করে—ভারতের অর্থনৈতিক শক্তির ভিত অনেক বেশি বিস্তৃত, গভীর ও বৈচিত্র্যময়। এই বাস্তবতা ভবিষ্যতে দেশের আর্থিক ও সামাজিক কাঠামো বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।

Advertisements