ভারত সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য মালদ্বীপে নির্দিষ্ট পরিমাণে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য রপ্তানির (India Exports) অনুমোদন দিয়েছে। এই পণ্যগুলির মধ্যে রয়েছে ডিম, আলু, পেঁয়াজ, চাল, গমের আটা, চিনি, ডাল, পাথরের খণ্ড (স্টোন অ্যাগ্রিগেট) এবং নদীর বালি। ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ ফরেন ট্রেড (ডিজিএফটি) একটি বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ভারত ও মালদ্বীপের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় এই রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
ডিজিএফটি-র বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত ও মালদ্বীপের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় ডিম, আলু, পেঁয়াজ, চাল, গমের আটা, চিনি, ডাল, স্টোন অ্যাগ্রিগেট এবং নদীর বালি মালদ্বীপে রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।” এই সময়ের মধ্যে এই পণ্যগুলির রপ্তানি যে কোনো বিদ্যমান বা ভবিষ্যতের নিষেধাজ্ঞা বা বিধিনিষেধ থেকে মুক্ত থাকবে।
India Exports পরিমাণ ও শর্তাবলী
অনুমোদিত পণ্যের নির্দিষ্ট পরিমাণের মধ্যে রয়েছে আলু ২২,৫৮৯ টন, পেঁয়াজ ৩৭,৫৩৭ টন, চাল ১,৩০,৪২৯ টন, গমের আটা ১১,১৪,৬২১ টন, চিনি ৬৭,৭১৯ টন, ডাল ৩৫০ টন, স্টোন অ্যাগ্রিগেট ১৩ লক্ষ টন এবং নদীর বালি ১৩ লক্ষ টন। এই রপ্তানি কঠোর নিয়মের অধীনে পরিচালিত হবে। যেসব পণ্যের রপ্তানি সাধারণত নিষিদ্ধ বা সীমাবদ্ধ, সেগুলি শুধুমাত্র ছয়টি নির্দিষ্ট কাস্টমস পোর্টের মাধ্যমে রপ্তানি করা যাবে। এই পোর্টগুলি হল মুন্দ্রা, তুতিকোরিন, কাণ্ডলা সহ আরও তিনটি।
নদীর বালি এবং স্টোন অ্যাগ্রিগেট রপ্তানির ক্ষেত্রে কঠোর পরিবেশগত নিয়ম মানতে হবে। কেমিক্যাল অ্যান্ড অ্যালাইড এক্সপোর্ট প্রমোশন কাউন্সিল (ক্যাপেক্সিল) নিশ্চিত করবে যে সরবরাহকারী এবং উত্তোলনকারীরা প্রয়োজনীয় পরিবেশগত ছাড়পত্র পেয়েছে। এছাড়াও, কোস্টাল রেগুলেশন জোন (সিআরজেড) নোটিফিকেশনের অধীনে নিষিদ্ধ এলাকায় বালি উত্তোলন করা যাবে না। রপ্তানিকারকদের অবশ্যই সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের নির্দিষ্ট নোডাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পরিবেশগত ছাড়পত্র নিতে হবে, যেখান থেকে বালি সংগ্রহ করা হবে।
ভারত-মালদ্বীপ বাণিজ্য সম্পর্ক
১৯৮১ সালে ভারত ও মালদ্বীপের মধ্যে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি প্রয়োজনীয় পণ্য রপ্তানির সুযোগ করে দেয়। এই চুক্তির আওতায় ভারত দীর্ঘদিন ধরে মালদ্বীপে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করে আসছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ বেড়ে ৯৭৮.৫৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ৯৭৩.৩৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই বৃদ্ধি দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়।
মালদ্বীপ থেকে ভারত প্রধানত স্ক্র্যাপ ধাতু আমদানি করে, যেখানে ভারত মালদ্বীপে রপ্তানি করে বিভিন্ন প্রকৌশল ও শিল্প পণ্য, যেমন ওষুধ, রাডার যন্ত্রপাতি, পাথরের খণ্ড, সিমেন্ট এবং কৃষিজাত পণ্য, যার মধ্যে রয়েছে চাল, মশলা, ফল, সবজি এবং পোল্ট্রি পণ্য। এই রপ্তানি মালদ্বীপের অর্থনীতি এবং জনগণের জীবনযাত্রার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মালদ্বীপের নির্মাণ শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ
মালদ্বীপের দ্বীপপুঞ্জ এবং অ্যাটলগুলি সমুদ্র দ্বারা ঘেরা, যার ফলে সেখানে নির্মাণ শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় নদীর বালির স্থানীয় সরবরাহ অত্যন্ত সীমিত। এই কারণে মালদ্বীপকে বালি এবং স্টোন অ্যাগ্রিগেট আমদানি করতে হয়। ভারত থেকে ১৩ লক্ষ টন নদীর বালি এবং ১৩ লক্ষ টন স্টোন অ্যাগ্রিগেট রপ্তানির অনুমোদন মালদ্বীপের নির্মাণ শিল্পের জন্য একটি বড় সহায়তা হবে। এই পণ্যগুলি মালদ্বীপের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নির্মাণ প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কোটা বৃদ্ধি ও ভারতের প্রতিশ্রুতি
এই বছরের রপ্তানি কোটায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। ডিম, আলু, পেঁয়াজ, চিনি, চাল, গমের আটা এবং ডালের কোটা বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় বেশি। গত বছরও ভারত বিশ্বব্যাপী এই পণ্যগুলির রপ্তানির উপর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও মালদ্বীপে চাল, চিনি এবং পেঁয়াজ রপ্তানি অব্যাহত রেখেছিল। এই পদক্ষেপ ভারতের ‘নেবারহুড ফার্স্ট’ নীতির প্রতিফলন, যার মাধ্যমে ভারত তার প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে এবং তাদের উন্নয়নে সহায়তা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাণিজ্য
ভারত ও মালদ্বীপের মধ্যে সম্প্রতি কিছু রাজনৈতিক উত্তেজনা দেখা গেছে। মালদ্বীপের নতুন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু, যিনি চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষপাতী, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সামরিক কর্মীদের দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। এই পটভূমিতে ভারতের এই রপ্তানি অনুমোদন একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করার পাশাপাশি কূটনৈতিক সম্পর্কে স্থিতিশীলতা আনার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব
মালদ্বীপ ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী এবং ভারত মহাসাগর অঞ্চলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের এই রপ্তানি সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সহযোগিতার দিক থেকে নয়, কূটনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। মালদ্বীপের অর্থনীতি পর্যটন এবং নির্মাণ শিল্পের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ভারত থেকে এই প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ তাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় সহায়তা করবে। একই সঙ্গে, এটি ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে।
ভারত ও মালদ্বীপের মধ্যে দীর্ঘদিনের বাণিজ্য সম্পর্ক এই রপ্তানি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আরও জোরদার হয়েছে। ডিম, আলু, পেঁয়াজ, চাল, গমের আটা, চিনি, ডাল, স্টোন অ্যাগ্রিগেট এবং নদীর বালির মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের রপ্তানি মালদ্বীপের জনগণের জীবনযাত্রা এবং অর্থনীতিকে সহায়তা করবে। এই পদক্ষেপ ভারতের ‘নেবারহুড ফার্স্ট’ নীতির একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। তবে, রাজনৈতিক উত্তেজনার পটভূমিতে এই সিদ্ধান্ত কীভাবে দুই দেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করে, তা ভবিষ্যতে দেখার বিষয়।