ভারতেই তৈরি সস্তা MRI, স্বাস্থ্যখরচ কমার পথে বড় সাফল্য

ভারতের স্বাস্থ্য প্রযুক্তি ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী সাফল্য এল। দীর্ঘ ১২ বছরের গবেষণা ও উন্নয়নের পর সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হল ১.৫ টেসলা এমআরআই (MRI) মেশিন।…

india-develops-low-cost-mri-machine-voxelgrids-healthcare-breakthrough

ভারতের স্বাস্থ্য প্রযুক্তি ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী সাফল্য এল। দীর্ঘ ১২ বছরের গবেষণা ও উন্নয়নের পর সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হল ১.৫ টেসলা এমআরআই (MRI) মেশিন। বেঙ্গালুরুভিত্তিক সংস্থা VoxelGrids তৈরি করা এই যন্ত্রটি বাজারে আসার ফলে চিকিৎসা খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে গ্রাম ও মফস্বল এলাকার মানুষের কাছে আধুনিক স্ক্যান পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি এক বড় পদক্ষেপ।

Advertisements

এই দেশীয় MRI মেশিনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল— এতে লিকুইড হিলিয়াম ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। এতদিন পর্যন্ত আমদানিকৃত অধিকাংশ MRI মেশিনেই বিপুল পরিমাণ তরল হিলিয়াম লাগে, যা দুষ্প্রাপ্য ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সেই কারণেই একটি MRI বসাতে খরচ হতো কোটি কোটি টাকা। কিন্তু VoxelGrids-এর তৈরি নতুন মেশিনে সেই নির্ভরতা তুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে নির্মাণ খরচ প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে, পাশাপাশি বিদ্যুৎ খরচও কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ।

   

ভারতের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় বড় স্বস্তি

বর্তমানে ভারতে প্রতি ১০ লক্ষ মানুষের জন্য গড়ে মাত্র ৩.৫টি MRI মেশিন রয়েছে। যেখানে উন্নত দেশগুলিতে এই সংখ্যা ২০ থেকে ২৫-এরও বেশি। এর ফলেই গ্রাম বা ছোট শহরের মানুষকে এমআরআই করাতে বড় শহরে যেতে হয়, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই বিপুল টাকা খরচ করতে হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘাটতি দূর করতে দেশীয়ভাবে তৈরি সাশ্রয়ী MRI মেশিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

এই নতুন প্রযুক্তির প্রথম ব্যবহার শুরু হয়েছে মহারাষ্ট্রের চন্দ্রপুর ক্যানসার কেয়ার ফাউন্ডেশন-এ। সেখানে ‘পে-পর-ইউজ’ বা ব্যবহার অনুযায়ী অর্থ দেওয়ার মডেলে এই MRI পরিষেবা চালু হয়েছে। ফলে রোগীদের এককালীন বড় অঙ্কের খরচ না করেও উন্নত স্ক্যান করানোর সুযোগ মিলছে। স্বাস্থ্য মহলের মতে, এই মডেল ভবিষ্যতে গ্রামীণ ও আধা-শহরাঞ্চলে দ্রুত জনপ্রিয় হতে পারে।

১২ বছরের গবেষণার ফল

VoxelGrids সংস্থাটি প্রায় এক যুগ ধরে এই প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। ভারতেই নকশা, ইঞ্জিনিয়ারিং ও উৎপাদনের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। ফলে এটি কেবল একটি যন্ত্র নয়, বরং “মেক ইন ইন্ডিয়া” উদ্যোগের বাস্তব উদাহরণ বলেই মনে করা হচ্ছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা বছরে প্রায় ২০ থেকে ২৫টি MRI ইউনিট উৎপাদন করতে সক্ষম এবং ধাপে ধাপে উৎপাদন আরও বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

এই প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে একাধিক সংস্থা। এর মধ্যে রয়েছে Zoho কর্পোরেশনের ৫০ লক্ষ ডলারের বিনিয়োগ, পাশাপাশি টাটা ট্রাস্টস এবং কেন্দ্র সরকারের অধীন BIRAC (Biotechnology Industry Research Assistance Council)-এর অনুদান। এই যৌথ উদ্যোগই ভারতের মেডিক্যাল ডিভাইস ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতা জোরদার করেছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: মোবাইল MRI ও রপ্তানি

VoxelGrids এখানেই থামতে চাইছে না। সংস্থার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে মোবাইল MRI ইউনিট তৈরি করা, যা ভ্যান বা বিশেষ গাড়িতে বসিয়ে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে নিয়ে যাওয়া যাবে। এতে দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী মানুষও সহজে উন্নত স্ক্যান পরিষেবা পাবেন।

এছাড়াও, ভবিষ্যতে এই ভারতীয় MRI বিদেশে রপ্তানির পরিকল্পনাও রয়েছে। বিশেষ করে আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কম খরচের উন্নত মেডিক্যাল যন্ত্রের চাহিদা বাড়ছে। সেক্ষেত্রে ভারতের এই প্রযুক্তি বিশ্ববাজারেও বড় ভূমিকা নিতে পারে।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত

চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্ভাবন ভারতের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে। কম খরচে MRI উপলব্ধ হলে ক্যানসার, নিউরোলজিক্যাল সমস্যা, হাড় ও মেরুদণ্ড সংক্রান্ত রোগ দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। ফলে রোগ নির্ণয় যেমন সহজ হবে, তেমনই চিকিৎসাও শুরু করা যাবে আগেভাগে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, দেশেই তৈরি সস্তা MRI মেশিন শুধু প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়, এটি সাধারণ মানুষের চিকিৎসা অধিকারকে আরও নাগালের মধ্যে আনার এক বড় পদক্ষেপ। আত্মনির্ভর ভারতের পথে এটি নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক, যা আগামী দিনে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করাবে।

Advertisements