আগামী ১ এপ্রিল, ২০২৬ থেকে ভারতের আয়কর বিভাগ (Income Tax Dept) করদাতাদের উপর নজরদারি আরও কঠোর করতে চলেছে। নতুন আয়কর বিলের প্রস্তাব অনুযায়ী, যদি কর বিভাগের কাছে এমন তথ্য থাকে যে কোনও ব্যক্তি কর ফাঁকি দিচ্ছেন বা তাঁর অপ্রকাশিত আয়, সম্পত্তি, সোনা, গহনা বা অন্যান্য মূল্যবান সম্পদ রয়েছে, তবে তাঁরা আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করে সেই ব্যক্তির সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, অনলাইন বিনিয়োগ অ্যাকাউন্ট, ট্রেডিং অ্যাকাউন্ট এবং ব্যক্তিগত ইমেল পরীক্ষা করতে পারবে। এই প্রস্তাবিত আইনটি বর্তমানে সংসদে আলোচনার জন্য উত্থাপিত হয়েছে এবং এটি ১৯৬১ সালের আয়কর আইনের পরিবর্তে কার্যকর করা হবে।
কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ গত ১৩ ফেব্রুয়ারি লোকসভায় এই নতুন আয়কর বিলটি উত্থাপন করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে এই বিলটি আগামী বর্ষাকালীন অধিবেশনে বিস্তারিত আলোচনার জন্য গৃহীত হবে। এই বিলে ব্যক্তি, ব্যবসায়ী এবং অলাভজনক সংস্থাগুলির মতো বিভিন্ন শ্রেণির করদাতাদের জন্য নতুন নিয়ম ও পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে, বিলের ২৪৭ নম্বর ধারাটি বিশেষভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। অনেকে মনে করছেন, এই ধারাটি আয়কর বিভাগকে আরও বেশি ক্ষমতা প্রদান করছে, যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
নতুন Income Tax বিলের ২৪৭ নম্বর ধারায় কী বলা হয়েছে?
নতুন আয়কর বিলের ২৪৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী, যদি কোনও সক্ষম কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য থাকে যে কোনও ব্যক্তি তলব বা নোটিশ সত্ত্বেও তাঁর হিসাবের বই, নথি বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সংরক্ষিত তথ্য প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়েছেন, অথবা কর বিভাগের কাছে এমন সন্দেহ হয় যে ওই ব্যক্তি এমন কোনও সম্পদ বা তথ্য গোপন করছেন যা তাঁর আয় বা সম্পত্তির অংশ এবং যা করের আওতায় প্রকাশ করা হয়নি, তবে কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে পারবে।
এই পদক্ষেপগুলির মধ্যে রয়েছে
১. তল্লাশি ও জব্দকরণ: কর্মকর্তারা যে কোনও ভবন, জায়গা, জাহাজ, যানবাহন বা বিমানে প্রবেশ করে তল্লাশি চালাতে পারবেন, যেখানে তাঁরা সন্দেহ করেন যে অপ্রকাশিত সম্পদ, হিসাবের বই বা ইলেকট্রনিক তথ্য রাখা হয়েছে।
২. ইলেকট্রনিক রেকর্ডে প্রবেশ: যদি কোনও ব্যক্তির কাছে ইলেকট্রনিক রেকর্ড, কম্পিউটার সিস্টেম বা তথ্য থাকে, তবে কর্মকর্তারা সেই ব্যক্তিকে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা (যেমন অ্যাক্সেস কোড) প্রদানের নির্দেশ দিতে পারবেন।
৩. তালা ভাঙার ক্ষমতা: যদি কোনও দরজা, বাক্স, লকার বা অন্যান্য স্থানের চাবি বা অ্যাক্সেস না পাওয়া যায়, তবে কর্মকর্তারা তালা ভেঙে প্রবেশ করতে পারবেন এবং কম্পিউটার সিস্টেমে অ্যাক্সেস কোড ওভাররাইড করতে পারবেন।
৪. ব্যক্তিগত তল্লাশি: যদি সন্দেহ হয় যে কোনও ব্যক্তি তাঁর শরীরে এই ধরনের নথি বা সম্পদ লুকিয়ে রেখেছেন, তবে তাঁর তল্লাশি করা যাবে।
৫. নথি ও সম্পদ জব্দ: কর্মকর্তারা হিসাবের বই, নথি, কম্পিউটার সিস্টেম বা সম্পদ জব্দ করতে পারবেন। তবে, ব্যবসায়িক স্টক-ইন-ট্রেড জব্দ করা যাবে না।
৬. অস্থায়ী জব্দকরণের আদেশ: যদি কোনও মূল্যবান জিনিস বা সম্পদ শারীরিকভাবে জব্দ করা সম্ভব না হয় (যেমন, ওজন বা বিপজ্জনক প্রকৃতির কারণে), তবে তার মালিককে একটি আদেশ দেওয়া হবে যাতে তিনি অনুমতি ছাড়া তা সরাতে বা ব্যবহার করতে না পারেন।
ভার্চুয়াল ডিজিটাল স্পেস কী?
নতুন আয়কর বিলে ‘ভার্চুয়াল ডিজিটাল স্পেস’ বলতে সোশ্যাল মিডিয়া, ইমেল, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, ট্রেডিং ও বিনিয়োগ অ্যাকাউন্ট এবং রিমোট সার্ভারের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলিকে বোঝানো হয়েছে। এর মানে হল, কর বিভাগ এখন আপনার অনলাইন কার্যকলাপের উপর নজর রাখতে পারবে এবং সেখান থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে।
এটি আপনাকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে?
এই নতুন আইনের ফলে আয়কর বিভাগের তল্লাশি ও জব্দকরণের ক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে। কর্মকর্তারা আপনার ইমেল, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম এবং সোশ্যাল মিডিয়া কার্যকলাপ পরীক্ষা করে দেখতে পারবেন যে আপনি আপনার সম্পূর্ণ আয় বা সম্পদ প্রকাশ করেছেন কি না। উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনি সোশ্যাল মিডিয়ায় বিলাসবহুল জীবনযাত্রার ছবি পোস্ট করেন, কিন্তু আপনার ঘোষিত আয়ের সঙ্গে তা মেলে না, তবে কর বিভাগ তদন্ত শুরু করতে পারে। একইভাবে, আপনার ব্যাঙ্ক বা ট্রেডিং অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেন থাকলে তা তাঁদের নজরে আসতে পারে।
সমালোচনা ও উদ্বেগ
এই ধারাটি নিয়ে অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সমালোচকদের মতে, এটি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার উপর আঘাত হানতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়া বা ইমেলের মতো ব্যক্তিগত স্থানে কর বিভাগের প্রবেশাধিকার অনেকের কাছে অস্বস্তিকর মনে হচ্ছে। তবে, সরকারের দাবি, এই ক্ষমতা শুধুমাত্র তখনই ব্যবহার করা হবে যখন কর ফাঁকির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা সন্দেহ থাকবে।
নতুন আয়কর বিলের এই প্রস্তাবটি কর ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও কঠোর করার লক্ষ্যে আনা হয়েছে। তবে, এটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে কী প্রভাব পড়বে, তা সময়ই বলে দেবে। আপাতত, করদাতাদের জন্য পরামর্শ হল, তাঁদের আয় ও সম্পদের হিসাব সঠিকভাবে রাখা এবং কর ফাঁকি এড়ানো, যাতে এই নতুন নিয়মের আওতায় না পড়তে হয়।