৫ বছরে ৫০ লক্ষ টাকা গড়তে সেরা বিনিয়োগ কৌশল

Smart Investment Strategies

মাত্র ৫ বছরে ৫০ লক্ষ টাকার একটি কর্পাস গড়ে তোলা একটি চ্যালেঞ্জিং লক্ষ্য। স্বল্প সময়ের বিনিয়োগ পরিসর এবং এর সঙ্গে যুক্ত ঝুঁকির কারণে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে (Smart Investment Strategies)। তবে, সঠিক পরিকল্পনা, পোর্টফোলিওর বৈচিত্র্যকরণ এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ বিনিয়োগের মাধ্যমে এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর সম্ভাবনা বাড়ানো সম্ভব। আর্থিক বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগই টেকসই আর্থিক নিরাপত্তার চাবিকাঠি। তবে, শুধুমাত্র বৈচিত্র্যকরণই ফলাফলের নিশ্চয়তা দেয় না; সঠিক পোর্টফোলিও বণ্টন কৌশল নির্ধারণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ কিন্তু কম রিটার্নের সরঞ্জাম যেমন ফিক্সড ডিপোজিট (এফডি)-কে সম্পূর্ণভাবে উচ্চ রিটার্নের বিনিয়োগ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সবার জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে। তবে, যারা একাধিক আর্থিক সঞ্চয় সরঞ্জাম ব্যবহার করেন, তাদেরও বোঝা উচিত যে বৈচিত্র্যকরণ একা সাফল্য নিশ্চিত করে না। ঝুঁকি সহনশীলতা, আর্থিক লক্ষ্য এবং বাজারের পরিস্থিতি বিবেচনা করে একটি সুষম বিনিয়োগ কৌশল তৈরি করা জরুরি।

   

তিন ধাপের পরিকল্পনা: সোনা, ডেট মিউচুয়াল ফান্ড এবং ইকুইটি

ধরে নেওয়া যাক, সোনা, ইকুইটি এবং ফিক্সড ডিপোজিটের মিশ্রণে একটি বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগ পোর্টফোলিও ৫০ লক্ষ টাকার কর্পাস গড়তে সাহায্য করতে পারে। তবে, কিছু বিনিয়োগ সরঞ্জামে ঝুঁকি বেশি এবং নিশ্চিত রিটার্নের নিশ্চয়তা নেই। তাই সক্রিয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। এখানে তিনটি প্রধান বিনিয়োগ বিকল্পের মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জনের একটি পরিকল্পনা তুলে ধরা হলো।

১. সোনায় বিনিয়োগ
সোনা দীর্ঘদিন ধরে একটি নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ২০২৪ সালে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে চাহিদা বৃদ্ধির কারণে সোনা ২৬% রিটার্ন দিয়েছে। ২০২৫ সালে এখন পর্যন্ত এর রিটার্ন প্রায় ১৪.১%। ঐতিহাসিকভাবে, ১৯৯৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সোনার গড় বার্ষিক রিটার্ন ছিল প্রায় ১০%, যা এফডি-র তুলনায় আকর্ষণীয়।

গুড রিটার্নস ওয়েবসাইটের সোনা রিটার্ন ক্যালকুলেটর অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে প্রতি মাসে ১০,০০০ টাকা সোনায় বিনিয়োগ করলে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এর মূল্য দাঁড়াতো ৯.৫ লক্ষ টাকা। এখানে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৬ লক্ষ টাকা, যা ৫ বছরে ৫৮.৭% মুনাফা নির্দেশ করে। তবে, সোনার দাম বাজারের ওঠানামার উপর নির্ভর করে, তাই এটি নিশ্চিত রিটার্নের গ্যারান্টি দেয় না।

২. ডেট মিউচুয়াল ফান্ড
ডেট মিউচুয়াল ফান্ড ইকুইটি-কেন্দ্রিক ফান্ডের তুলনায় তুলনামূলকভাবে নিরাপদ এবং এটি সরকারি ও কর্পোরেট বন্ডের মতো ফিক্সড-ইনকাম সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ করে। ঐতিহাসিক প্রবণতা অনুযায়ী, এই ফান্ডগুলি ৫ বছরে ১০-১৩% বার্ষিক রিটার্ন দিতে পারে।
ধরা যাক, একটি ডেট ফান্ড বার্ষিক ১২% রিটার্ন দিচ্ছে। এই ক্ষেত্রে প্রতি মাসে ২৫,০০০ টাকা বিনিয়োগ করলে ৫ বছরে মোট বিনিয়োগ হবে ১৫ লক্ষ টাকা এবং কর্পাস দাঁড়াবে ২০,২৭,৫৯০ টাকা। এটি পোর্টফোলিওতে স্থিতিশীলতা আনতে সাহায্য করবে।

৩. ইকুইটি মিউচুয়াল ফান্ড
ইকুইটি ফান্ড ঝুঁকিপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ রিটার্ন দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যদি একটি ভালো লার্জ ক্যাপ ফান্ড গত তিন বছরে বার্ষিক ১৫% রিটার্ন দিয়ে থাকে, তবে প্রতি মাসে ২৩,০০০ টাকা বিনিয়োগে ৫ বছরে মোট বিনিয়োগ হবে ১৩.৮ লক্ষ টাকা এবং কর্পাস হবে ২০,০৮,৮৬৮ টাকা।

মোট বিনিয়োগ ও কর্পাস

এই তিনটি বিনিয়োগের সমষ্টি হল:
সোনা: মাসিক ১০,০০০ টাকা, ৫ বছরে কর্পাস ৯.৫ লক্ষ টাকা।
ডেট ফান্ড: মাসিক ২৫,০০০ টাকা, ৫ বছরে কর্পাস ২০.২৭ লক্ষ টাকা।
ইকুইটি ফান্ড: মাসিক ২৩,০০০ টাকা, ৫ বছরে কর্পাস ২০.০৮ লক্ষ টাকা।
মোট মাসিক বিনিয়োগ: ৬০,০০০ টাকা। ৫ বছরে মোট বিনিয়োগ: ৩৪.৮ লক্ষ টাকা। মোট কর্পাস: প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা। তবে, এই হিসাব ঐতিহাসিক পারফরম্যান্সের উপর ভিত্তি করে করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে একই ফলাফল নাও হতে পারে।

ঝুঁকি ও সতর্কতা

এফডি নিরাপদ এবং নিশ্চিত রিটার্ন দিলেও এর রিটার্ন কম। সোনা একটি নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কাজ করে, তবে এর দাম বাজারের ওঠানামার উপর নির্ভরশীল। ইকুইটি সবচেয়ে বেশি অস্থির, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সর্বোচ্চ রিটার্ন দেয়। ৫ বছরের মতো স্বল্প সময়ের জন্য সাধারণত ডেট ফান্ডের পরামর্শ দেওয়া হয়, তবে ৫০ লক্ষ টাকার লক্ষ্যে পৌঁছতে এটি একা যথেষ্ট নয়। তাই ইকুইটি এবং সোনার সঙ্গে মিলিয়ে একটি সুষম পোর্টফোলিও তৈরি করা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

আর্থিক পরিকল্পনাকারীরা জানাচ্ছেন, বিনিয়োগের আগে নিজের ঝুঁকি সহনশীলতা এবং আর্থিক লক্ষ্য পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি। বাজারের অস্থিরতার সময় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নিয়মিত পোর্টফোলিও পর্যালোচনা এবং সক্রিয় ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। এছাড়া, বিনিয়োগের শৃঙ্খলা এবং ধৈর্য ধরে পরিকল্পনা মেনে চলা এই লক্ষ্য অর্জনের মূল চাবিকাঠি।

৫ বছরে ৫০ লক্ষ টাকার কর্পাস গড়তে হলে মাসে ৬০,০০০ টাকার বিনিয়োগ এবং সঠিক কৌশল প্রয়োজন। সোনা, ডেট ফান্ড এবং ইকুইটির মিশ্রণে এই লক্ষ্য সম্ভব, তবে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং বাজারের প্রবণতা নজরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর্থিক স্বাধীনতার এই পথে সঠিক পরিকল্পনাই হবে আপনার সাফল্যের চাবিকাঠি।

এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে Google News-এ Kolkata24x7 ফলো করুন