এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ড অর্গানাইজেশন (EPFO) সম্প্রতি দাবি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া সহজ করতে দুটি নতুন পদ্ধতি চালু করেছে। এই পরিবর্তনগুলো প্রায় ৮ কোটি সদস্যের জন্য দাবি প্রক্রিয়াকরণকে দ্রুততর করবে এবং দাবি প্রত্যাখ্যান সংক্রান্ত সমস্যা কমাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সদস্য এবং নিয়োগকর্তা উভয়ের জন্যই এই নতুন পদক্ষেপ সুবিধা ও স্বচ্ছতা নিয়ে আসবে।
এতদিন ইপিএফও সদস্যদের অনলাইনে দাবি দাখিলের সময় চেকের ছবি বা ব্যাঙ্ক পাসবুকের সত্যায়িত কপি আপলোড করতে হতো। নিয়োগকর্তাদেরও আবেদনকারীদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের বিবরণ যাচাই করতে হতো। এখন এই পদক্ষেপগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে, যা প্রক্রিয়াটিকে সরল করেছে এবং সদস্য ও নিয়োগকর্তাদের জন্য সময় ও শ্রম বাঁচিয়েছে।
পাইলট প্রোগ্রাম থেকে সর্বজনীন প্রয়োগ
এই সহজীকরণ প্রথমে ২৮ মে, ২০২৪-এ একটি পাইলট প্রোগ্রাম হিসেবে শুরু হয়েছিল, যা কেওয়াইসি (নো ইওর কাস্টমার) আপডেট করা ১.৭ কোটি সদস্যের জন্য প্রযোজ্য ছিল। এই প্রোগ্রামের সাফল্যের পর ইপিএফও এটিকে সব সদস্যের জন্য প্রসারিত করেছে। বর্তমানে সদস্যদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ইউনিভার্সাল অ্যাকাউন্ট নম্বর (ইউএএন)-এর সঙ্গে যুক্ত করার সময়ই যাচাই করা হয়। ফলে অতিরিক্ত নথি জমা দেওয়ার প্রয়োজন আর নেই। এর ফলে অস্পষ্ট বা অপঠনযোগ্য আপলোডের কারণে দাবি প্রত্যাখ্যানের ঘটনা কমবে এবং সংশ্লিষ্ট অভিযোগও হ্রাস পাবে।
ইপিএফও-এর এই পদক্ষেপের ফলে দাবি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া আরও দ্রুত এবং স্বচ্ছ হবে। পূর্বে, সদস্যদের দাবি প্রত্যাখ্যান হলে তারা বারবার নথি জমা দিতে বাধ্য হতেন, যা সময়সাপেক্ষ এবং হতাশাজনক ছিল। এখন এই সমস্যা অনেকটাই দূর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট যাচাইয়ের বিলম্ব হ্রাস
২০২৪-২৫ আর্থিক বছরে ১.৩ কোটি সদস্য তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ইউএএন-এর সঙ্গে যুক্ত করার জন্য আবেদন করেছিলেন। এই প্রক্রিয়ায় ব্যাঙ্কগুলো গড়ে তিন দিন সময় নিয়েছে যাচাইয়ের জন্য, কিন্তু নিয়োগকর্তারা গড়ে ১৩ দিন সময় নিয়েছেন অনুমোদনের জন্য। এই বিলম্ব দাবি প্রক্রিয়াকরণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইপিএফও-এর নতুন নিয়মে নিয়োগকর্তাদের অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা বাদ দেওয়ায় এই সমস্যা অনেকটাই কমবে।
বর্তমানে প্রতি মাসে অবদানকারী ৭.৭৪ কোটি সদস্যের মধ্যে ৪.৮৩ কোটি সদস্য ইতিমধ্যে তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ইউএএন-এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তবে, ১৪.৯৫ লক্ষ সদস্যের অনুমোদন এখনও নিয়োগকর্তাদের স্তরে আটকে রয়েছে। নতুন নিয়মের ফলে এই ১৪.৯৫ লক্ষ সদস্য তাৎক্ষণিকভাবে উপকৃত হবেন, কারণ তাদের দাবি প্রক্রিয়াকরণে আর নিয়োগকর্তার অনুমোদনের অপেক্ষা করতে হবে না।
ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট পরিবর্তনের সুবিধা
ইপিএফও-এর বিবৃতি অনুযায়ী, এই সরলীকৃত প্রক্রিয়া সদস্যদের জন্য ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট পরিবর্তনকেও সহজ করবে। যারা ইতিমধ্যে যুক্ত করা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট পরিবর্তন করতে চান, তারা নতুন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর এবং আইএফএসসি কোড প্রবেশ করিয়ে আধার-ভিত্তিক ওটিপি (ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড) দিয়ে তা প্রমাণীকরণ করতে পারবেন। এই পদ্ধতি সদস্যদের জন্য আরও নমনীয়তা এবং স্বাধীনতা নিয়ে আসবে।
সদস্যদের জন্য সুবিধা
ইপিএফও-এর এই উদ্যোগ সদস্যদের জন্য একাধিক সুবিধা নিয়ে এসেছে। প্রথমত, দাবি দাখিলের সময় অতিরিক্ত নথি আপলোডের ঝামেলা থেকে মুক্তি মিলেছে। দ্বিতীয়ত, নিয়োগকর্তাদের যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা বাদ দেওয়ায় প্রক্রিয়াটি দ্রুততর হয়েছে। তৃতীয়ত, অস্পষ্ট নথির কারণে দাবি প্রত্যাখ্যানের ঘটনা কমে যাবে, যা সদস্যদের হতাশা এবং অভিযোগ হ্রাস করবে।
একজন ইপিএফও সদস্য বলেন, “আগে চেকের ছবি আপলোড করতে গিয়ে বারবার সমস্যা হতো। এখন এই নতুন নিয়মে আমাদের সময় বাঁচবে এবং দাবি দ্রুত পাওয়া যাবে।” আরেকজন সদস্য বলেন, “নিয়োগকর্তার অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করতে হতো, যা অনেক সময় বিলম্বের কারণ হতো। এখন এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া গেছে।”
নিয়োগকর্তাদের জন্য সুবিধা
নিয়োগকর্তারাও এই পরিবর্তন থেকে উপকৃত হবেন। পূর্বে তাদের প্রতিটি সদস্যের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট যাচাই করতে হতো, যা একটি সময়সাপেক্ষ কাজ ছিল। গড়ে ১৩ দিন সময় লাগলেও, অনেক ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি সময় নিত। এখন এই দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ায় নিয়োগকর্তাদের কাজের চাপ কমবে এবং তারা তাদের মূল কার্যক্রমে বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন।
EPFO-এর লক্ষ্য
ইপিএফও-এর এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো সদস্যদের জন্য দাবি নিষ্পত্তি প্রক্রিয়াকে দ্রুত, স্বচ্ছ এবং ব্যবহারকারী-বান্ধব করা। সংস্থাটি জানিয়েছে, “আমরা আমাদের সদস্যদের সুবিধা বাড়াতে এবং প্রক্রিয়াগত জটিলতা কমাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই নতুন পদ্ধতি সেই লক্ষ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।” ২০২৪-২৫ আর্থিক বছরে ইপিএফও-এর এই উদ্যোগ ৮ কোটি সদস্যের জীবনকে আরও সহজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভারতের শ্রমজীবী মানুষের জন্য ইপিএফও একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। প্রতি মাসে অবদানকারী ৭.৭৪ কোটি সদস্যের মধ্যে অনেকেই তাদের সঞ্চয়ের ওপর নির্ভর করে জরুরি প্রয়োজন মেটান। দাবি নিষ্পত্তির বিলম্ব তাদের আর্থিক স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলত। এই নতুন পদ্ধতি তাদের জন্য একটি বড় স্বস্তি নিয়ে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সরলীকরণ ইপিএফও-এর প্রতি সদস্যদের আস্থা বাড়াবে এবং আরও বেশি মানুষকে এই প্রকল্পে যোগ দিতে উৎসাহিত করবে। এটি সরকারের ডিজিটাল ইন্ডিয়া উদ্যোগের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা প্রযুক্তির মাধ্যমে জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে চায়।
ইপিএফও-এর নতুন পদ্ধতি দাবি নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। চেক বা পাসবুক আপলোড এবং নিয়োগকর্তার যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা বাদ দেওয়ায় সদস্যরা এখন দ্রুত এবং সহজে তাদের অর্থ পাবেন। ১৪.৯৫ লক্ষ সদস্যের জন্য তাৎক্ষণিক সুবিধা এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট পরিবর্তনের সহজ প্রক্রিয়া এই উদ্যোগের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। ইপিএফও-এর এই পদক্ষেপ শ্রমজীবী মানুষের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং তাদের জীবনকে আরও সহজ করতে একটি বড় ভূমিকা পালন করবে।