পোস্ট অফিস ডিপোজিট, পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড (PPF), সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা (SSY), এবং ন্যাশনাল সেভিংস সার্টিফিকেট (NSC)-এর মতো সরকারি সঞ্চয় প্রকল্পগুলির সুদের হার প্রতি ত্রৈমাসিকে সংশোধন করা হয়। বিনিয়োগকারীরা এই হারের পরিবর্তনের দিকে সবসময় নজর রাখেন। এবার কেন্দ্রীয় সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ত্রৈমাসিক, অর্থাৎ এপ্রিল থেকে জুন ২০২৫ পর্যন্ত, এই প্রকল্পগুলির সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ত্রৈমাসিক (১ এপ্রিল ২০২৫ থেকে ৩০ জুন ২০২৫) জন্য বিভিন্ন সঞ্চয় প্রকল্পের সুদের হার ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চতুর্থ ত্রৈমাসিক (১ জানুয়ারি ২০২৫ থেকে ৩১ মার্চ ২০২৫) এর জন্য ঘোষিত হারের মতোই থাকবে।” এর ফলে গত পাঁচ ত্রৈমাসিক ধরে এই হারে কোনও পরিবর্তন হয়নি।
সঞ্চয় প্রকল্প কী?
সরকারি সঞ্চয় প্রকল্প হল এমন সঞ্চয় উপকরণ, যা কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনা করে নাগরিকদের নিয়মিত সঞ্চয়ে উৎসাহিত করতে। এই প্রকল্পগুলি তিনটি বিভাগে বিভক্ত—সেভিংস ডিপোজিট, সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প এবং মাসিক আয় পরিকল্পনা।
সেভিংস ডিপোজিটের মধ্যে রয়েছে ১ থেকে ৩ বছরের টাইম ডিপোজিট এবং ৫ বছরের রেকারিং ডিপোজিট। এছাড়াও সেভিংস সার্টিফিকেট যেমন ন্যাশনাল সেভিংস সার্টিফিকেট (NSC) এবং কিষাণ বিকাশ পত্র (KVP) এই বিভাগে পড়ে। সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড (PPF), সুকন্যা সমৃদ্ধি অ্যাকাউন্ট এবং সিনিয়র সিটিজেন সেভিংস স্কিম। মাসিক আয় পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে মান্থলি ইনকাম অ্যাকাউন্ট।
PPF, পোস্ট অফিস সেভিংস এবং টার্ম ডিপোজিট, NSC এবং SSY-এর মতো সঞ্চয় প্রকল্পের সুদের হার প্রতি ত্রৈমাসিকের শেষে পর্যালোচনা করা হয় এবং পরবর্তী ত্রৈমাসিকের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সর্বশেষ ক্ষেত্রে, অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২৪-এর জি-সেক (গভর্নমেন্ট সিকিউরিটিজ) লভ্যাংশের ভিত্তিতে এই হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
সর্বশেষ সুদের হার কী?
এপ্রিল-জুন ২০২৫ ত্রৈমাসিকের জন্য বর্তমান সুদের হার নিম্নরূপ:
সেভিংস ডিপোজিট: ৪ শতাংশ
১ বছরের পোস্ট অফিস টাইম ডিপোজিট: ৬.৯ শতাংশ
২ বছরের পোস্ট অফিস টাইম ডিপোজিট: ৭.০ শতাংশ
৩ বছরের পোস্ট অফিস টাইম ডিপোজিট: ৭.১ শতাংশ
৫ বছরের পোস্ট অফিস টাইম ডিপোজিট: ৭.৫ শতাংশ
৫ বছরের রেকারিং ডিপোজিট: ৬.৭ শতাংশ
ন্যাশনাল সেভিংস সার্টিফিকেট (NSC): ৭.৭ শতাংশ
কিষাণ বিকাশ পত্র (KVP): ৭.৫ শতাংশ (১১৫ মাসে ম্যাচিউর হবে)
পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড (PPF): ৭.১ শতাংশ
সুকন্যা সমৃদ্ধি অ্যাকাউন্ট (SSY): ৮.২ শতাংশ
সিনিয়র সিটিজেন সেভিংস স্কিম: ৮.২ শতাংশ
মান্থলি ইনকাম অ্যাকাউন্ট: ৭.৪ শতাংশ
এই হারগুলি গত জানুয়ারি-মার্চ ২০২৫ ত্রৈমাসিকের সঙ্গে অভিন্ন। সরকারের এই সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেছে, বিশেষ করে যাঁরা নিরাপদ এবং নিশ্চিত রিটার্নের জন্য এই প্রকল্পগুলির ওপর নির্ভর করেন।
ব্যাঙ্ক FD বনাম পোস্ট অফিস ডিপোজিট: সুদের হারের তুলনা:
পোস্ট অফিস ৬.৯ শতাংশ থেকে ৭.১ শতাংশ পর্যন্ত সুদের হার দিচ্ছে ফিক্সড ডিপোজিটে (FD), যেখানে ব্যাঙ্কগুলি সাধারণ জনগণের জন্য ৩ শতাংশ থেকে ৮.০৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিচ্ছে। প্রবীণ নাগরিকদের জন্য ব্যাঙ্কগুলি অতিরিক্ত সুদের হার প্রদান করে। ব্যাঙ্কবাজার ডটকম-এর তথ্য অনুযায়ী, বন্ধন ব্যাঙ্ক ১-৩ বছরের মেয়াদে ৮.০৫ শতাংশ সুদ দিচ্ছে, যা বর্তমানে সর্বোচ্চ।
যদিও গত পাঁচ ত্রৈমাসিক ধরে সঞ্চয় প্রকল্পের সুদের হার অপরিবর্তিত রয়েছে, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার মানিটারি পলিসি কমিটি (RBI MPC) এপ্রিলে দ্বিতীয়বারের জন্য সুদের হার কমাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি ব্যাঙ্ক FD-র হারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, তবে পোস্ট অফিস প্রকল্পগুলি সরকারি গ্যারান্টি সহ স্থিতিশীল রিটার্ন দেয়।
বিনিয়োগকারীদের জন্য তাৎপর্য:
সরকার প্রতি ত্রৈমাসিকে পোস্ট অফিস এবং ব্যাঙ্কের মাধ্যমে পরিচালিত সঞ্চয় প্রকল্পগুলির সুদের হার ঘোষণা করে। এই প্রকল্পগুলি নিরাপদ বিনিয়োগের বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয়, কারণ এগুলি সরকারি সমর্থনপুষ্ট এবং ঝুঁকিমুক্ত। PPF-এর মতো প্রকল্পে ৭.১ শতাংশ সুদ এবং এসএসওয়াই-এর মতো প্রকল্পে ৮.২ শতাংশ সুদ এখনও অনেক ব্যাঙ্ক FD-র তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, “সুদের হার অপরিবর্তিত থাকায় বিনিয়োগকারীরা তাঁদের আর্থিক পরিকল্পনায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারবেন। তবে বাজারের অবস্থা এবং RBI-এর নীতির ওপর নজর রাখা জরুরি।” সিনিয়র সিটিজেন সেভিংস স্কিমে ৮.২ শতাংশ সুদ প্রবীণ নাগরিকদের জন্য আকর্ষণীয়, যখন এসএসওয়াই কন্যা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।
এপ্রিল-জুন ২০২৫-এর জন্য সঞ্চয় প্রকল্পের সুদের হার অপরিবর্তিত থাকায় বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীল রিটার্নের ওপর ভরসা রাখতে পারেন। ব্যাঙ্ক FD-র তুলনায় পোস্ট অফিস প্রকল্পগুলি নিরাপত্তা ও নিশ্চিত আয়ের দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে। তবে আগামী দিনে RBI-এর নীতি পরিবর্তনের ফলে বাজারে কী প্রভাব পড়ে, তা দেখার বিষয়। বিনিয়োগের আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে পরিকল্পনা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।