ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ার (এনপিসিআই) সম্পূর্ণ মালিকানাধীন সংস্থা এনপিসিআই ভিম সার্ভিসেস লিমিটেড সম্প্রতি ভারত ইন্টারফেস ফর মানি ৩.০ (BHIM 3.0 ) অ্যাপটি উন্মোচন করেছে। এই নতুন সংস্করণে বেশ কিছু আকর্ষণীয় ফিচার যুক্ত হয়েছে, যা ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা উন্নত করার পাশাপাশি আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে। ২০১৬ সালে প্রথম চালু হওয়ার পর এটি ভিম অ্যাপের তৃতীয় বড় আপগ্রেড। এই সংস্করণটি ব্যবহারকারীদের জন্য সহজলভ্যতা, ব্যবহারের সুবিধা এবং আধুনিক আর্থিক সরঞ্জামের উপর বিশেষ জোর দিয়েছে।
ভিম ৩.০-এর লক্ষ্য: ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা উন্নত করা
রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার নির্বাহী পরিচালক বিবেক দীপ এই উন্মোচন অনুষ্ঠানে বলেন, “গ্রাহকদের সন্তুষ্টি পর্যবেক্ষণ এবং যারা ইতিমধ্যে অ্যাপটি ব্যবহার করছেন তাদের জন্য উপযুক্ত সমাধান ব্যবস্থা নিশ্চিত করার উপর আমাদের মনোযোগ থাকা উচিত। এতে তারা অন্য কোনও প্ল্যাটফর্মে চলে যাবে না।” ভিম ৩.০-এর মাধ্যমে এনপিসিআই ডিজিটাল পেমেন্টকে আরও সহজ, নিরাপদ এবং সকলের জন্য অ্যাক্সেসযোগ্য করে তুলতে চায়।
ভিম ৩.০-এর নতুন ফিচারসমূহ
১. ভিম ভেগা: এটি ভিম ৩.০-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। ভিম ভেগা হল একটি ইন-অ্যাপ পেমেন্ট সলিউশন, যা অনলাইন মার্চেন্ট প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সংযুক্ত। এর মাধ্যমে গ্রাহকরা তৃতীয় পক্ষের অ্যাপে না গিয়ে সরাসরি ভিম অ্যাপের মধ্যে তাৎক্ষণিক পেমেন্ট করতে পারবেন। এটি ব্যবসায়ীদের জন্যও লেনদেনকে আরও সহজ করে তুলবে।
২. বহুভাষিক সমর্থন: ভিম ৩.০ এখন ১৫টিরও বেশি ভারতীয় ভাষায় উপলব্ধ। বাংলা, হিন্দি, তামিল, তেলুগু, মারাঠি-সহ বিভিন্ন ভাষার সমর্থন এই অ্যাপটিকে ভারতের বিভিন্ন ভাষাগত অঞ্চলের মানুষের কাছে আরও অ্যাক্সেসযোগ্য করে তুলেছে।
৩. খরচ ভাগাভাগি (স্প্লিট এক্সপেন্সেস): এই ফিচারের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা সহজেই পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে খরচ ভাগ করতে পারবেন। ভাড়া, রেস্তোরাঁয় খাওয়া বা গ্রুপ কেনাকাটার মতো খরচের মোট পরিমাণ ভাগ করে অ্যাপের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক পেমেন্ট করা যাবে। এটি হিসাব-নিকাশের ঝামেলা কমিয়ে দেবে।
৪. ফ্যামিলি মোড: ভিম ৩.০-এ যুক্ত হয়েছে ফ্যামিলি মোড। এই ফিচারে ব্যবহারকারীরা তাদের পরিবারের সদস্যদের অ্যাপে যুক্ত করতে পারবেন, শেয়ার করা খরচের হিসাব রাখতে পারবেন এবং নির্দিষ্ট পেমেন্টের দায়িত্ব বণ্টন করতে পারবেন। এটি পরিবারের আর্থিক পরিকল্পনাকে আরও সুসংগঠিত করবে।
৫. খরচের বিশ্লেষণ (স্পেন্ডিং অ্যানালিসিস): একটি নতুন ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা তাদের মাসিক খরচের একটি স্পষ্ট চিত্র পাবেন। অ্যাপটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে খরচকে বিভিন্ন বিভাগে ভাগ করে দেবে, যা বাজেট পরিচালনাকে সহজ করে তুলবে। জটিল স্প্রেডশিটের প্রয়োজন ছাড়াই এটি আর্থিক পরিকল্পনায় সহায়তা করবে।
৬. অ্যাকশন নিডেড: এটি একটি বিল্ট-ইন টাস্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট ফিচার। এটি ব্যবহারকারীদের ভিম অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত পেন্ডিং বিলের কথা মনে করিয়ে দেবে, ইউপিআই লাইট সক্রিয় করার জন্য প্রম্পট করবে এবং লাইট ব্যালেন্স কমে গেলে সতর্ক করবে। এটি আর্থিক কার্যকলাপে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করবে।
এনপিসিআই-এর দৃষ্টিভঙ্গি
এনপিসিআই ভিম সার্ভিসেসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ললিতা নটরাজ বলেন, “একটি পরিচ্ছন্ন ইউজার ইন্টারফেস এবং গ্রাহক অভিজ্ঞতা প্রদান করলে বাজারে স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি ঘটবে। আমরা এতদিন এটিকে বাণিজ্যিক অ্যাপ হিসেবে প্রচার করিনি, বরং একটি রেফারেন্স অ্যাপ হিসেবে দেখেছি। তবে এখন আমরা ব্যবহারকারী ধরে রাখার উপর কাজ করব। গ্রাহক অধিগ্রহণ এবং ধরে রাখার মাধ্যমে আমরা একটি অর্থপূর্ণ ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি করতে পারব।” তিনি আরও জানান, ভিম ৩.০ “ভারতের জন্য তৈরি” একটি অ্যাপ, যা নিরাপত্তা, সুবিধা এবং আর্থিক ক্ষমতায়নের উপর জোর দেয়।
ভিম অ্যাপের ইতিহাস ও গুরুত্ব
২০১৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভিম অ্যাপটি চালু করেছিলেন। ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস (ইউপিআই) প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে তৈরি এই অ্যাপ ডিজিটাল লেনদেনে বিপ্লব এনেছে। ব্যবহারকারীরা তাদের ইউপিআই আইডি এবং পিন ব্যবহার করে সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পেমেন্ট করতে পারেন। এছাড়াও, কিউআর কোড স্ক্যান করে টাকা পাঠানোর সুবিধা এটিকে আরও বহুমুখী করে তুলেছে। ভিম ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বাংলার প্রতিক্রিয়া
বাংলার ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহারকারীরা ভিম ৩.০-এর এই আপডেটকে স্বাগত জানিয়েছেন। বাংলা ভাষায় অ্যাপটি ব্যবহার করার সুযোগ এবং খরচ ভাগাভাগি বা ফ্যামিলি মোডের মতো ফিচারগুলো এখানকার মানুষের জন্য দৈনন্দিন জীবনে সুবিধা নিয়ে আসবে। একজন ব্যবহারকারী বলেন, “এখন আমি আমার পরিবারের খরচের হিসাব রাখতে পারব এবং বন্ধুদের সঙ্গে বিল ভাগ করা অনেক সহজ হবে।”
ভিম ৩.০-এর ভবিষ্যৎ
এনপিসিআই জানিয়েছে, ভিম ৩.০ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ধাপে ধাপে চালু করা হবে এবং এপ্রিল ২০২৫-এর মধ্যে এটি সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধ হবে। এই অ্যাপটি কম ইন্টারনেট সংযোগের এলাকায়ও কার্যকরভাবে কাজ করার জন্য তৈরি করা হয়েছে, যা গ্রামীণ ভারতের মানুষের জন্য বড় সুবিধা হবে। এছাড়াও, ব্যবসায়ীদের জন্য ভিম ভেগার মতো ফিচার ই-কমার্স লেনদেনকে আরও দ্রুত ও সুবিধাজনক করে তুলবে।
ভিম ৩.০ ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এর নতুন ফিচারগুলো ব্যবহারকারীদের জন্য লেনদেনকে আরও স্মার্ট, সহজ এবং নিরাপদ করে তুলবে। বাংলার মানুষও এই আপডেটের মাধ্যমে তাদের দৈনন্দিন আর্থিক কার্যকলাপে নতুন সুবিধা পাবেন। ভিম ৩.০-এর সাফল্য ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।