কর্মহীন ২৫৮ কারখানার লক্ষাধিক কর্মী! ভারত দখলের হুঙ্কার দেয় বাংলাদেশ

bangladesh-garment-industry-crisis-258-factories-closed-workers-jobless

বাংলাদেশের (Bangladesh) অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলে পরিচিত রেডিমেড গার্মেন্টস (আরএমজি) শিল্প (Garment industry) আজ গভীর সংকটে। গত এক বছরে দেশজুড়ে অন্তত ২৫৮টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন লক্ষাধিক শ্রমিক। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (BGMEA)-এর সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, শুধু এই শিল্পেই এক লক্ষেরও বেশি মানুষ সরাসরি কাজ হারিয়েছেন। এই ঘটনা শুধু শিল্পক্ষেত্রেই নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতাতেও গভীর প্রভাব ফেলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিপর্যয়ের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। ২০২৪ সালের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের জেরে দেশজুড়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব পড়েছে শিল্পক্ষেত্রে। অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে থাকা নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ Muhammad Yunus-এর সময়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ। বিভিন্ন জায়গায় চরমপন্থী গোষ্ঠীর বিক্ষোভ, ইসলামপন্থী সংগঠনের মিছিল ও কর্মসূচির কারণে বহু কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। বিদেশি ক্রেতারা নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কিত হয়ে একের পর এক অর্ডার বাতিল করেছেন।

   

বাংলাদেশের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যম The Daily Star এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলির রিপোর্টে বলা হয়েছে, কারখানা বন্ধ হওয়ার মূল কারণগুলির মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক সহিংসতা, শ্রমিক অসন্তোষ, বিদ্যুৎ ও কাঁচামালের সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার অভাব। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি—বর্তমানে যা প্রায় ৯.৫ শতাংশের কাছাকাছি। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ায় শ্রমিকদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে উঠেছে, ফলে অসন্তোষ আরও তীব্র হয়েছে।

এই সংকটের মধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ও বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বাংলাদেশের কিছু কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর তরফে “ভারত দখল” করার হুঙ্কার শোনা যাচ্ছে। বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এই ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। ভারতীয় নেটিজেনদের একাংশ এই বক্তব্যকে বিদ্রূপের চোখে দেখলেও, অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং কর্মসংস্থানের অভাবে বিপুল সংখ্যক মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিতে পারে। এতে রাজ্যের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর প্রভাব পড়তে পারে বলেও মত বিশ্লেষকদের।

কর্মহীন শ্রমিকদের অবস্থা সবচেয়ে করুণ। বহু পরিবার সম্পূর্ণভাবে গার্মেন্টস শিল্পের উপর নির্ভরশীল ছিল। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা হঠাৎই আয়ের উৎস হারিয়েছেন। ঢাকার সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ-সহ একাধিক শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে। কেউ কেউ গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন, আবার কেউ অন্য পেশায় কাজ খুঁজছেন—যা বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত কঠিন।

অন্যদিকে, রপ্তানি আয়ের উপরও এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। গার্মেন্টস শিল্প বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ জোগান দেয়। কারখানা বন্ধ হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় কমছে, যার ফলে আমদানি ব্যয় মেটানোও কঠিন হয়ে উঠছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের এই সংকট শুধু একটি শিল্পের পতনের গল্প নয়; এটি একটি দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, চরমপন্থার উত্থান এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থার প্রতিচ্ছবি। লক্ষাধিক কর্মীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, আর প্রতিবেশী দেশগুলিও এর প্রভাব নিয়ে চিন্তিত। এখন দেখার, বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক মহল কীভাবে এই সংকট মোকাবিলায় এগিয়ে আসে।

এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে Google News-এ Kolkata24x7 ফলো করুন