গাড়ি উৎপাদনে সরকারের 26,000 কোটি পিএলআই স্কিম ঘোষণা

কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা বৃহস্পতিবার অটোমোবাইল এবং অটো উপাদান শিল্পের জন্য প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ স্কিমে (PLI scheme) ২৫,৯৩৮ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন করেছে। এই সিদ্ধান্ত শিল্পের উৎপাদন…

PLI Scheme to Boost Auto & EV Sector

কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা বৃহস্পতিবার অটোমোবাইল এবং অটো উপাদান শিল্পের জন্য প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ স্কিমে (PLI scheme) ২৫,৯৩৮ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন করেছে। এই সিদ্ধান্ত শিল্পের উৎপাদন খরচের বাধা দূর করে উন্নত অটোমোটিভ প্রযুক্তি (AAT) পণ্যের দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করবে। সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “PLI-অটো স্কিমের লক্ষ্য শিল্পের খরচের অসুবিধা কাটিয়ে উঠে ভারতে উন্নত প্রযুক্তির অটোমোবাইল পণ্য তৈরির প্রচার করা।”

   

এই ঘোষণা এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বুধবারের ঘোষণার পর, যেখানে তিনি ২ এপ্রিল থেকে অটো আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা বলেছেন। এই পরিস্থিতিতে ভারতের এই PLI স্কিম দেশীয় উৎপাদনকে শক্তিশালী করে আমদানি নির্ভরতা কমাতে এবং শিল্পে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

Advertisements

PLI scheme এর উদ্দেশ্য ও প্রভাব

সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো ভারতে একটি শক্তিশালী এবং বিশ্বমানের অটোমোবাইল শিল্প গড়ে তোলা, যা উন্নত প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে চলবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। এই স্কিম উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করবে, দেশীয় নির্মাতাদের সমর্থন দেবে এবং আমদানির উপর নির্ভরতা হ্রাস করবে। সরকার জানিয়েছে, এই প্রকল্প শিল্পের বৃদ্ধির পাশাপাশি ভারতকে বৈদ্যুতিক যান (EV) উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কেন্দ্রে পরিণত করতে সাহায্য করবে।

২০২১ সালের নভেম্বরে শিল্পের স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনার পর ভারী শিল্প মন্ত্রণালয় ১৯টি AAT যানবাহন ক্যাটাগরি এবং ১০৩টি AAT উপাদানকে এই স্কিমের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণা করে। এই উপাদানগুলোর মধ্যে বৈদ্যুতিক যানের ব্যাটারি, মোটর এবং অন্যান্য উন্নত প্রযুক্তির অংশ রয়েছে।

আর্থিক সহায়তা ও বিনিয়োগ

২০২৪ অর্থবছর ছিল PLI-অটো স্কিমের প্রথম পারফরম্যান্স বছর। ২০২৫ অর্থবছর পর্যন্ত এই স্কিমের আওতায় মোট ৩২২ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। সরকারের বিবৃতি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই স্কিমের আওতায় থাকা কোম্পানিগুলো ২৫,০০০ কোটি টাকারও বেশি মূলধন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই বিনিয়োগের মধ্যে রয়েছে নতুন উৎপাদন কারখানা স্থাপন এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, বিশেষ করে বৈদ্যুতিক যানবাহন খাতে।

টাটা মোটরস এবং মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মাহিন্দ্রার মতো শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি EV উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে বড় বিনিয়োগের ঘোষণা করেছে। টাটা মোটরস গুজরাটের সানন্দে একটি নতুন EV প্ল্যান্ট স্থাপন করছে, যেখানে বছরে ২ লক্ষ বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। মাহিন্দ্রা তাদের ‘বর্ন ইলেকট্রিক’ সিরিজের জন্য মহারাষ্ট্রে উৎপাদন বাড়াচ্ছে। এই বিনিয়োগ ভারতের অটোমোবাইল শিল্পকে বিশ্ব বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।

কর্মসংস্থান ও স্থানীয়করণ

PLI স্কিমের মাধ্যমে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে হাজার হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। উৎপাদন, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট এবং গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হয়েছে। বৈদ্যুতিক যানবাহন উৎপাদনের স্থানীয়করণ ভারতের প্রধান উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে—যেমন তামিলনাড়ু, মহারাষ্ট্র এবং গুজরাটে—কর্মসংস্থান বাড়িয়েছে। সরকারের মতে, এই স্কিম শুধু শিল্পের বৃদ্ধিই নয়, তরুণদের জন্য নতুন ক্যারিয়ারের পথও খুলেছে।

বিশ্ব বাজারে ভারতের অবস্থান

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা ভারতের অটোমোবাইল শিল্পের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হলেও, PLI স্কিম এই প্রভাব কমাতে সাহায্য করবে। আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে ভারত নিজেকে একটি স্বনির্ভর অটোমোবাইল হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। বৈদ্যুতিক যানবাহনের ক্ষেত্রে ভারত ইতিমধ্যেই চীন ও জাপানের মতো দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এই স্কিমের মাধ্যমে স্থানীয় কোম্পানিগুলো বিশ্ব বাজারে তাদের পণ্য রপ্তানি করার ক্ষমতা বাড়াবে।

বাঙালিদের জন্য তাৎপর্য

পশ্চিমবঙ্গের অটোমোবাইল শিল্পের জন্যও এই স্কিম গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্যে অটো উপাদান উৎপাদনের কয়েকটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প রয়েছে, যারা এই স্কিমের আওতায় সুবিধা পেতে পারে। কলকাতা ও হাওড়ার মতো শিল্পাঞ্চলে কর্মসংস্থান বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া, বৈদ্যুতিক যানবাহনের জনপ্রিয়তা বাড়লে রাজ্যে পরিবেশবান্ধব পরিবহনের প্রসার ঘটতে পারে। বাঙালি উদ্যোক্তারা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অটো শিল্পে নতুন পথ খুঁজতে পারেন।

স্কিমের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ

২০২৪ অর্থবছরে PLI স্কিমের প্রথম বছরে ৩২২ কোটি টাকা বিতরণ একটি শুভ সূচনা। সরকারের লক্ষ্য, ২০২৭ সালের মধ্যে এই স্কিমের মাধ্যমে ৫০,০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। এর মধ্যে বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল প্রযুক্তির উপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। ২০২৫ সালে আরও বেশি কোম্পানি এই স্কিমের আওতায় আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় সরকারের ২৫,৯৩৮ কোটি টাকার PLI স্কিম অটোমোবাইল শিল্পের জন্য একটি গেম-চেঞ্জার। এটি দেশীয় উৎপাদন বাড়াবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং ভারতকে বিশ্বের অটোমোবাইল মানচিত্রে শক্তিশালী অবস্থান দেবে। টাটা, মাহিন্দ্রার মতো বড় কোম্পানির বিনিয়োগ এবং স্থানীয়করণের প্রচেষ্টা ভারতের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে। এই স্কিমের সাফল্য ভারতীয় অর্থনীতি ও শিল্পের জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।