নতুন বছরের শুরুতেই রাজধানী দিল্লির রাজপথে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। সরকারি উদ্যোগে চালু হচ্ছে ‘ভারত ট্যাক্সি’ (Bharat Taxi)—একটি সমবায় ভিত্তিক রাইড-হেলিং পরিষেবা, যা সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামবে ওলা, উবের ও র্যাপিডোর মতো বেসরকারি সংস্থার বিরুদ্ধে। আগামী ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে দিল্লিতে পরীক্ষামূলকভাবে এই পরিষেবা চালু হওয়ার কথা। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে, এই ট্যাক্সিগুলিতে দেখা যাবে পরিচিত হলুদ ট্যাক্সির রং ও নকশা, যা একসময় দিল্লি ও কলকাতার শহুরে যাতায়াতের প্রতীক ছিল।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, এই উদ্যোগ পরিচালনা করবে সহকার ট্যাক্সি কো-অপারেটিভ লিমিটেড (Sahkar Taxi Cooperative Limited)। এটি মূলত চালকদের মালিকানাধীন একটি সমবায় সংস্থা, যেখানে ড্রাইভাররাই হবেন অংশীদার। ফলে বেসরকারি অ্যাপভিত্তিক সংস্থাগুলির মতো কমিশন নির্ভর শোষণের অভিযোগ কমবে বলেই দাবি কর্তৃপক্ষের। সরকারের বক্তব্য, এই প্রকল্পের লক্ষ্য শুধু যাত্রী পরিষেবা নয়, বরং চালকদের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও ন্যায্য আয়ের সুযোগ নিশ্চিত করা।
সার্জ প্রাইস নয়, স্থির ভাড়া—মূল আকর্ষণ
‘ভারত ট্যাক্সি’-র সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল সার্জ প্রাইসিং না থাকা। উৎসব, বৃষ্টি বা ব্যস্ত সময়ে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই ওলা-উবেরের বিরুদ্ধে উঠেছে। নতুন এই সরকারি মডেলে ভাড়া হবে তুলনামূলকভাবে স্থির ও স্বচ্ছ। যাত্রীরা আগেই জানতে পারবেন কত টাকা দিতে হবে, মাঝপথে ভাড়া বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে না।
একই সঙ্গে চালকদের জন্যও থাকছে নিশ্চিত আয়ের কাঠামো। সমবায় মডেলের ফলে কমিশনের হার সীমিত থাকবে এবং লাভের অংশ চালকদের মধ্যেই বণ্টিত হবে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে অ্যাপ-ক্যাব চালকদের যে অসন্তোষ জমে উঠেছিল, তা অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
হলুদ ট্যাক্সির প্রত্যাবর্তন
এই উদ্যোগে প্রতীকী দিকও কম নয়। হলুদ ট্যাক্সি মানেই একসময় নির্ভরযোগ্য, সহজলভ্য ও সরকারি নজরদারির মধ্যে থাকা পরিবহণ ব্যবস্থা। দিল্লির রাস্তায় আবার সেই হলুদ রং ফিরিয়ে এনে সরকার একদিকে যেমন নস্টালজিয়াকে কাজে লাগাতে চাইছে, তেমনই যাত্রীদের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতার বার্তা দিতে চাইছে। আধুনিক অ্যাপভিত্তিক বুকিংয়ের সঙ্গে পুরনো ট্যাক্সি সংস্কৃতির মেলবন্ধনই এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য।
প্রযুক্তি ও সমবায়ের মেলবন্ধন
‘ভারত ট্যাক্সি’ একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল অ্যাপের মাধ্যমেই চলবে। যাত্রীরা স্মার্টফোনে অ্যাপ ডাউনলোড করে ক্যাব বুক করতে পারবেন, লাইভ ট্র্যাকিং, ডিজিটাল পেমেন্ট ও অভিযোগ জানানোর সুবিধাও থাকবে। তবে পার্থক্য হল, এই প্ল্যাটফর্মের মালিকানা থাকবে কোনও কর্পোরেট সংস্থার হাতে নয়, বরং সমবায় কাঠামোর অধীনে চালকদের যৌথ নিয়ন্ত্রণে।
সরকারি মহলের মতে, এটি ভারতের প্রথম বড় মাপের কো-অপারেটিভ রাইড-হেলিং মডেল, যা ভবিষ্যতে অন্যান্য রাজ্যেও চালু করা যেতে পারে।
সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া
সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ঘোষণা ঘিরে ইতিমধ্যেই আলোড়ন পড়েছে। অনেকেই আশা প্রকাশ করেছেন যে এতে ভাড়া স্থিতিশীল থাকবে এবং শেষ মুহূর্তে রাইড বাতিলের প্রবণতা কমবে। আবার কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন—দিল্লির বাইরে কবে এই পরিষেবা পৌঁছবে? মুম্বই, বেঙ্গালুরু, কলকাতার মতো বড় শহরগুলিও কি ভবিষ্যতে এই প্রকল্পের আওতায় আসবে?
একাংশের মতে, যদি সত্যিই সরকার ভাড়া নিয়ন্ত্রণ ও পরিষেবার মান বজায় রাখতে পারে, তবে এটি বেসরকারি অ্যাপগুলির একচেটিয়া দাপট ভাঙতে পারে।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপট
গত কয়েক বছরে ভারতে অ্যাপ-ক্যাব পরিষেবা শহুরে যাতায়াতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু একই সঙ্গে বেড়েছে অভিযোগ—অতিরিক্ত ভাড়া, ড্রাইভার ক্যানসেলেশন, কমিশন কাটা, আয়ের অনিশ্চয়তা। এই প্রেক্ষাপটে ‘ভারত ট্যাক্সি’ প্রকল্পকে অনেকেই দেখছেন একটি বিকল্প, জনমুখী মডেল হিসেবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ২০২৬ সালের শুরুতে দিল্লির রাস্তায় হলুদ ট্যাক্সির প্রত্যাবর্তন শুধুই একটি নতুন পরিষেবা নয়, বরং শহুরে পরিবহণ ব্যবস্থায় সরকারি হস্তক্ষেপের এক নতুন দৃষ্টান্ত। এখন দেখার বিষয়, বাস্তবে এই উদ্যোগ কতটা সফল হয় এবং সাধারণ যাত্রী ও চালক—দু’পক্ষের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারে ‘ভারত ট্যাক্সি’।
