৮ম বেতন কমিশনের সুপারিশে বড় চমকের সম্ভাবনা, জানুন বিস্তারিত

কেন্দ্রীয় সরকারের অষ্টম বেতন কমিশন (8th Pay Commission) নিয়ে বর্তমানে আলোচনায় নতুন মোড় এসেছে। সূত্রের খবর, যদি মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) বেসিক বেতনের সঙ্গে একীভূত করার…

8th Pay Commission

কেন্দ্রীয় সরকারের অষ্টম বেতন কমিশন (8th Pay Commission) নিয়ে বর্তমানে আলোচনায় নতুন মোড় এসেছে। সূত্রের খবর, যদি মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) বেসিক বেতনের সঙ্গে একীভূত করার প্রস্তাব গৃহীত হয়, তাহলে অষ্টম বেতন কমিশন প্রাথমিকভাবে যে ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর প্রস্তাব করতে পারে বলে আশা করা হয়েছিল, তা উল্লেখযোগ্যভাবে কম হতে পারে। এই বিষয়ে দুইজন শ্রমিক ইউনিয়ন নেতা, যাঁরা এই আলোচনায় জড়িত, এনডিটিভি প্রফিটকে জানিয়েছেন যে, এই পরিস্থিতিতে ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর “সাম্প্রতিক সংবাদপত্রে যা বলা হয়েছে, তার চেয়ে কম হতে পারে।”

   

ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর হল সেই গুণক যা সরকারি কর্মচারীদের বেতন এবং অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন সংশোধনের জন্য ব্যবহৃত হয়। ২০১৬ সালে সপ্তম বেতন কমিশন ২.৫৭ ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর প্রয়োগ করেছিল। শ্রমিক ফোরামগুলো এবার ২.৫৭ থেকে ২.৮৬ পর্যন্ত ফিটমেন্ট ফ্যাক্টরের দাবি জানিয়ে আসছিল। তবে, সূত্র জানাচ্ছে, ডিএ বেসিক বেতনের সঙ্গে মিশে গেলে এই গুণক কমে যেতে পারে। এর ফলে বিভিন্ন ভাতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশোধিত হবে, যা কর্মচারীদের জন্য উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।

Advertisements

ডিএ-বেসিক বেতন একীভূতকরণের সম্ভাবনা

ন্যাশনাল কাউন্সিল-জয়েন্ট কনসালটেটিভ মেশিনারি (এনসি-জেসিএম)-এর একজন সিনিয়র নেতা ফেব্রুয়ারিতে এনডিটিভি প্রফিটকে বলেছিলেন, তাঁরা অষ্টম বেতন কমিশনের কাছে অন্তত ২.৫৭ ফিটমেন্ট ফ্যাক্টরের দাবি জানাবেন, এমনকি তার থেকে বেশিও চাইতে পারেন। তবে, এই ইউনিয়ন নেতারা এখন জানাচ্ছেন, ডিএ বেসিক বেতনের সঙ্গে একীভূত হলে তাঁদের অবস্থান কিছুটা নরম হতে পারে। গত সপ্তাহে ডিএ-তে ২% বৃদ্ধির ঘোষণার পর বর্তমানে এটি সপ্তম বেতন কমিশনের বেসিক বেতনের ৫৫%-এ পৌঁছেছে। শ্রমিক ফোরামগুলো দাবি করছে, এর ৫০% বেসিক বেতনের সঙ্গে একীভূত করা হোক। এই পরিস্থিতিতে ন্যূনতম বেসিক বেতন ১৮,০০০ টাকা থেকে বেড়ে ২৭,০০০ টাকায় উন্নীত হতে পারে, এমনকি অষ্টম বেতন কমিশন কার্যকর হওয়ার আগেই।

এরপর বেতন কমিশন যে ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর প্রস্তাব করবে, তা এই সংশোধিত বেসিক বেতনের ওপর প্রয়োগ হবে। ফলে বেতন বৃদ্ধি আরও উল্লেখযোগ্য হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যদি ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ২.২৮ হয়, তাহলে ২৭,০০০ টাকার ওপর এটি প্রয়োগ করে নতুন বেসিক বেতন ৬১,৫৬০ টাকায় পৌঁছতে পারে। এটি বর্তমান ১৮,০০০ টাকার তুলনায় অনেক বেশি।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

পঞ্চম বেতন কমিশনের সময় (১৯৯৬-২০০৬) নিয়ম ছিল, ডিএ ৫০% ছাড়ালে তা বেসিক বেতনের সঙ্গে একীভূত করা হবে। সেই মোতাবেক, ২০০৪ সালে সরকার এই পদক্ষেপ নিয়েছিল। কিন্তু ষষ্ঠ বেতন কমিশন (২০০৬-২০১৬) এই নিয়ম বাতিল করে। সপ্তম বেতন কমিশন এটি পুনর্বহালের প্রস্তাব দিলেও তৎকালীন সরকার তা গ্রহণ করেনি। এখন শ্রমিক নেতারা আশা করছেন, অষ্টম বেতন কমিশনের আগে এই পুরনো নিয়ম ফিরিয়ে আনা হতে পারে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অবস্থান

গত মাসে সংসদে অর্থ মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে যে, বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের ডিএ বেসিক বেতনের সঙ্গে একীভূত করার কোনো প্রস্তাব বিবেচনাধীন নেই। তবে, ইউনিয়ন নেতারা বলছেন, মন্ত্রণালয় এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি নাকচ করেনি। একজন নেতা উল্লেখ করেছেন, “গত ডিসেম্বর পর্যন্ত বলা হচ্ছিল অষ্টম বেতন কমিশন গঠনের কোনো পরিকল্পনা নেই। কিন্তু জানুয়ারিতে মন্ত্রিসভা এটি অনুমোদন করেছে।” তাঁরা উল্লেখ করেছেন, এর আগে জাতীয় পেনশন সিস্টেমের (এনপিএস) বিকল্প নেই বলা হলেও গত বছর ইউনিফাইড পেনশন স্কিম (ইউপিএস) চালু হয়েছে। এই ঘটনাগুলো তাঁদের আশা জাগিয়েছে।

সম্ভাব্য প্রভাব

ডিএ বেসিক বেতনের সঙ্গে একীভূত হলে কর্মচারীদের হাতে নগদ অর্থ বাড়বে। বর্তমানে ন্যূনতম বেসিক বেতন ১৮,০০০ টাকা। ৫০% ডিএ (৯,০০০ টাকা) একীভূত হলে বেসিক বেতন ২৭,০০০ টাকায় উন্নীত হবে। এরপর ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর প্রয়োগ হলে বেতন আরও বাড়বে। তবে, ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর কম হলে সামগ্রিক বৃদ্ধি প্রত্যাশার তুলনায় কম হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যদি ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ২.০ হয়, তাহলে নতুন বেসিক বেতন হবে ৫৪,০০০ টাকা, যা ২.৮৬ হলে ৭৭,২২০ টাকা হতো।

পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও একই প্রভাব পড়বে। বর্তমানে ন্যূনতম পেনশন ৯,০০০ টাকা। ডিএ একীভূত হলে তা ১৩,৫০০ টাকায় উন্নীত হবে। ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ২.০ হলে পেনশন হবে ২৭,০০০ টাকা, আর ২.৮৬ হলে ৩৮,৬১০ টাকা।

অষ্টম বেতন কমিশনের গঠন

অষ্টম বেতন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে শীঘ্রই গঠিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই প্যানেল বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর এবং বেতন-পেনশন সংশোধনের অন্যান্য বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দেবে। এটি ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

শ্রমিকদের প্রত্যাশা

কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীরা দীর্ঘদিন ধরে বেতন বৃদ্ধির অপেক্ষায় রয়েছেন। ডিএ বেসিক বেতনের সঙ্গে একীভূত হলে তাৎক্ষণিক স্বস্তি মিলবে বলে তাঁরা মনে করছেন। একজন কর্মচারী বলেন, “মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে। ডিএ একীভূত হলে আমাদের কিছুটা সুবিধা হবে।” তবে, ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর কম হলে তাঁদের প্রত্যাশা পূরণ নাও হতে পারে।

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট

এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ৫০ লক্ষ কর্মচারী ও ৬৫ লক্ষ পেনশনভোগী এর সুবিধাভোগী। বেতন বৃদ্ধি অর্থনীতিতে চাঙ্গাভাব আনতে পারে, কিন্তু সরকারের আর্থিক বোঝাও বাড়বে। অর্থ মন্ত্রণালয়কে এই ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

অষ্টম বেতন কমিশন নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে রয়েছে। ডিএ-বেসিক বেতন একীভূতকরণ এবং ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী হবে, তা আগামী দিনে স্পষ্ট হবে। কর্মচারী ও পেনশনভোগীরা আশায় রয়েছেন, তাঁদের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবে এই নতুন কমিশন। তবে, সরকার কীভাবে এই দাবি ও বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।