ঢাকা: দীর্ঘ দুই বছর অপেক্ষার পর ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ট্যুরিস্ট ভিসা পরিষেবা পুনরায় চালু করা হয়েছে। আর এই ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ভারতজুড়ে পরিষেবা চালুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই ঢাকার পাঁচটি ভিসা আবেদন কেন্দ্রে উপচে পড়েছে মানুষের ভিড়। পরিষেবা শুরুর দিনেই প্রায় ১.৪০ লক্ষেরও বেশি আবেদন জমা পড়েছে, যা দুই দেশের নাগরিক সম্পর্কের বাস্তবতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। (India Bangladesh Tourist Visa)
কেন এই বিপুল চাহিদা?
ভারত ও বাংলাদেশের ৪,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত এবং গভীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক যোগসূত্র একে অপরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। রাজনৈতিক টানাপোড়েন থাকলেও, বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কাছে ভারত মানেই সাশ্রয়ী ও উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা, কেনাকাটা এবং আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করার শ্রেষ্ঠ গন্তব্য।
গত আগস্ট ২০২৪-এ শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দুই দেশের সম্পর্কে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। ছাত্র আন্দোলনের সময় ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রে হামলা ও কর্মীদের হুমকি দেওয়ার ঘটনার জেরে ভারত পর্যটন ভিসা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে ভারতবিরোধী মনোভাব এবং পাকিস্তান ঘেঁষা বিদেশনীতির কারণে সম্পর্কের গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়। তবে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারিক রহমানের আমলে পরিস্থিতির কিছুটা স্থিতিশীলতা এলেও দুই দেশের সম্পর্কে এখনও কিছুটা শীতলতা বজায় রয়েছে।
চিকিৎসা পরিষেবাই মূল চালিকাশক্তি
পর্যটন ভিসা কেবল ঘোরার জন্য নয়, বরং চিকিৎসার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত দুই বছরে মেডিকেল ভিসা সীমিত থাকায় সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও দীর্ঘসূত্রতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তথ্যানুযায়ী, এপ্রিল ২০২৩ থেকে মার্চ ২০২৪ পর্যন্ত ২১ লক্ষ বাংলাদেশি ভারতে এসেছিলেন, যা ভারতের মোট বিদেশি পর্যটকের ২০ শতাংশ। কিন্তু ভিসা পরিষেবা বন্ধ হওয়ার পর ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা কমে ৪.৭০ লক্ষে নেমে আসে। চীন, থাইল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের বাজেটের বাইরে হওয়ায়, ভারতই তাদের জন্য একমাত্র ভরসা। বিশেষ করে কলকাতার মতো শহর যেখানে ভাষা বা খাদ্যের কোনো বাধা নেই, সেখানে চিকিৎসা ও কেনাকাটার জন্য বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রথম পছন্দ।
ব্যবসায়িক মহলে স্বস্তি
ভিসা পরিষেবা চালুর খবরে পশ্চিমবঙ্গের, বিশেষ করে কলকাতার ব্যবসায়ী মহলে খুশির হাওয়া বইছে। কলকাতার নিউ মার্কেট সংলগ্ন এলাকায় বাংলাদেশি পর্যটকদের ভিড় না থাকায় গত দুই বছরে প্রায় ১,০০০ কোটি টাকার ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়েছে। ট্যুরিস্ট ভিসা পুনরায় চালু হওয়ায় এখন আবারও সেই এলাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতি পাবে বলে আশা করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
তবে এই ব্যাপক ভিড়কে কেন্দ্র করে সমালোচনার সুরও শোনা গেছে। নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন ফেসবুকে প্রশ্ন তুলেছেন, যারা ভারতবিরোধী স্লোগান দিয়েছিলেন বা ভারতের পতাকা অবমাননা করেছিলেন, তাদের অনেকেই এখন ভারতীয় ভিসার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছেন কি না।
সব মিলিয়ে, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের অস্থিরতাকে ছাপিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার প্রয়োজনে ভারত ও বাংলাদেশের পারস্পরিক নির্ভরতা যে আজও অটুট, ভিসা কেন্দ্রের এই লম্বা লাইনই তার প্রমাণ।





