নয়াদিল্লি: দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহের অসহনীয় দাবদাহ, গুমোট গরম এবং দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর বিলম্বিত উপস্থিতির পর অবশেষে দিল্লি-সহ গোটা উত্তর ভারতের জন্য স্বস্তির খবর। উপগ্রহ চিত্রে বঙ্গোপসাগরের উত্তরাংশ থেকে জম্মু ও কাশ্মীর পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ১,৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি মৌসুমী অক্ষরেখার (Monsoon Trough) সুস্পষ্ট অবয়ব ধরা পড়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, বায়ুমণ্ডলের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ব্যাপক বৃষ্টির পথ প্রশস্ত করতে চলেছে। (North India Monsoon Rain Forecast)
ভারতের আবহাওয়া দফতর (IMD) জানিয়েছে, মৌসুমী অক্ষরেখাটি ইতিমধ্যে গঠিত হলেও বর্তমানে তা হিমালয়ের পাদদেশ সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। তবে স্বস্তির বিষয় হল, এটি ধীরে ধীরে দক্ষিণ দিকে সরে এসে তার স্বাভাবিক অবস্থানে পৌঁছবে। এর ফলে উত্তর ভারত জুড়ে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির দাপট উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ১ থেকে ৪ জুলাইয়ের মধ্যে এই অঞ্চলে বর্ষা পুরোদমে সক্রিয় হয়ে উঠবে।
উপগ্রহ চিত্রে কীসের ইঙ্গিত?
ইনস্যাট-৩ডিএস (INSAT-3DS) উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত চিত্রে দেখা গিয়েছে, পূর্ব ভারত থেকে হিমালয় পর্যন্ত বিস্তীর্ণ বলয় জুড়ে তৈরি হয়েছে ঘন মেঘের জমাট আস্তরণ। টানা প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে বর্ষার শ্লথ গতির পর মৌসুমী বায়ুর এই নবজাগরণ দেশবাসীর কাছে এক বিরাট স্বস্তির বার্তা।
মৌসুমী অক্ষরেখা বা ‘ট্রাফ’ আসলে কী?
আবহাওয়া বিজ্ঞানের ভাষায়, এই অক্ষরেখাকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর মেরুদণ্ড বলা যেতে পারে। এটি মূলত বায়ুমণ্ডলের একটি প্রসারিত নিম্নচাপ বলয়, যা আরব সাগর এবং বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর পরিমাণে আর্দ্র বাতাস টেনে এনে ভারতের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করায়।
এই অক্ষরেখা যখন উত্তরের দিকে বেশি হেলে থাকে, তখন মূলত হিমালয়ের পাদদেশ সংলগ্ন এলাকাতেই বৃষ্টিপাত সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে দিল্লি, হরিয়ানা এবং রাজস্থানের মতো উত্তরের সমভূমিগুলি শুষ্ক ও তপ্তই থেকে যায়। চলতি জুন মাসে ঠিক এই প্রাকৃতিক খামখেয়ালিপনারই শিকার হয়েছে উত্তর ভারত।
অব্যাহত তাপপ্রবাহ ও চরম অস্বস্তি
বৃষ্টির অভাবে সোমবারও দিল্লিতে তাপপ্রবাহের পরিস্থিতি ছিল রীতিমতো ভয়াবহ। এদিন সফদরজংয়ে তাপমাত্রা ৪২° সেলসিয়াস এবং দিল্লি রিজ-এ ৪৩.৪° সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। রোহতকের পারদ ছুঁয়েছিল ৪৩.৫° সেলসিয়াসে। তবে গোটা অঞ্চলের মধ্যে রাজস্থানের শ্রীগঙ্গানগর ছিল উষ্ণতম, সেখানে তাপমাত্রা ৪৫.১° সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়। এই মারাত্মক গরমের সঙ্গে বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতা মিশে পরিস্থিতিকে চরম গুমোট ও শ্বাসরুদ্ধকর করে তুলেছে।
আসন্ন স্বস্তির পূর্বাভাস
আবহাওয়াবিদদের মতে, আবহাওয়ার এই নবগঠিত বিন্যাস খুব দ্রুত বর্ষাকে সক্রিয় করে তুলবে। মৌসুমী অক্ষরেখার সক্রিয়তার পাশাপাশি চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে বঙ্গোপসাগরে একটি নতুন নিম্নচাপ তৈরি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
এই জোড়া ফলায় মৌসুমী বায়ুর প্রবাহ আরও শক্তিশালী হবে এবং উত্তর ভারতে বিপুল পরিমাণে জলীয় বাষ্প প্রবেশ করবে। এর জেরে দিল্লি, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশের পশ্চিমাংশ এবং রাজস্থান জুড়ে ব্যাপক বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
আগামী ৪৮ ঘণ্টায় বিক্ষিপ্তভাবে প্রাক-বর্ষার বৃষ্টি হতে পারে। তবে সপ্তাহের মাঝামাঝি সময় থেকে এই বৃষ্টির তীব্রতা ও স্থায়িত্ব বাড়বে। আবহাওয়ার এই পূর্বাভাস সত্যি হলে, জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহেই দিল্লিতে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বর্ষার আগমন ঘটবে, যা চলতি মরশুমের ভয়াল তাপপ্রবাহ থেকে সাধারণ মানুষকে চরম স্বস্তি দেবে।





