ঢাকা: বাংলাদেশ সরকার ২০১৫ সালে ভারতের (Bangladesh)সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি বাতিল করে মোংলা বন্দর সংলগ্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়নের দায়িত্ব চিনের হাতে তুলে দিয়েছে। এই বন্দরটি ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
২০১৫ সালে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেই অনুসারে মোংলা ও মিরসরাইয়ে দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার কথা ছিল। কিন্তু পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার (মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে) ভারতীয় সংস্থাকে সময়মতো কাজ শুরু না করার অজুহাতে প্রকল্পটি বাতিল করে। এখন সেই জমিতেই চিনা রাষ্ট্রীয় সংস্থার সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ।
আরও দেখুনঃ নিটের পর টেট! পরীক্ষার ২৪ ঘণ্টা আগেই প্রশ্ন ফাঁস, বাতিল পরীক্ষা
মোংলা বন্দর বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর। বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত অবস্থানের কারণে এর গুরুত্ব অপরিসীম। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্যও এই বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাত্র ৮০ কিলোমিটার দূরত্বের কারণে এই এলাকায় চিনের উপস্থিতি ভারতের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক স্বার্থের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চিনের সঙ্গে নতুন চুক্তির ফলে মোংলা বন্দরকে আধুনিকায়ন করা হবে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু হবে। চীনা সংস্থা এতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করবে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ সরকারের দাবি, এর ফলে কর্মসংস্থান বাড়বে, বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রক এখনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয়নি।
তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, নয়াদিল্লিতে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ কৌশলের অংশ হিসেবে বঙ্গোপসাগরে তার প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা এখানে স্পষ্ট। গোয়াদার, হাম্বানটোটা, চট্টগ্রামের পর মোংলাও চিনের নিয়ন্ত্রণে চলে এলে ভারতের সমুদ্রপথে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ বাড়বে।বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
কেউ কেউ বলছেন, চিনের বিনিয়োগ দেশের উন্নয়নে সহায়ক হবে। অন্যরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, দীর্ঘমেয়াদে ঋণের ফাঁদে পড়তে হতে পারে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের এই পদক্ষেপকে ‘চিন-ঝোঁক’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে ভারতের সঙ্গে যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও বর্তমান প্রশাসনের আমলে তা অনেকটাই শিথিল হয়েছে।
মোংলা বন্দর প্রকল্প তারই একটি প্রতিফলন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই সিদ্ধান্ত শুধু অর্থনৈতিক নয়, স্পষ্টতই ভূ-রাজনৈতিক।ভারতের জন্য এখন চ্যালেঞ্জ হলো বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের নতুন পথ খুঁজে বের করা এবং বঙ্গোপসাগরে নিজস্ব প্রভাব বজায় রাখা। মোংলা বন্দরের এই পরিবর্তন শুধু দুই দেশের সম্পর্ককেই প্রভাবিত করবে না, পুরো উপমহাদেশের ভারসাম্যকেও নতুন করে সাজাতে পারে।



