কলকাতা: একসময় পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে কার্যত অপ্রতিদ্বন্দ্বী বলে বিবেচিত তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) এখন গভীর অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখে (Political Crisis)। বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির কাছে বড় পরাজয়ের পর থেকেই দলের অন্দরে অসন্তোষ বাড়ছিল। একের পর এক শীর্ষ নেতা পদত্যাগ করেছেন, বিদ্রোহী সাংসদরা আলাদা গোষ্ঠী তৈরি করেছেন এবং এখন দলের আর্থিক লেনদেন ঘিরে বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে এসেছে।
দলের বিদ্রোহী বিধায়ক তথা বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূলের তহবিলের উৎস নিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়ে নতুন বিতর্কের সূচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, দলের তহবিলে থাকা অর্থের উৎস ‘কাটমানি’, সরকারি প্রকল্পের অর্থ তছরুপ কিংবা বিভিন্ন দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। যদিও এই অভিযোগের পক্ষে এখনও কোনও প্রমাণ সামনে আসেনি। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “দলের অধিকাংশ বিধায়কই এই অর্থের উৎস সম্পর্কে কিছু জানেন না। কাটমানি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ বা দুর্নীতির টাকা থেকে এই তহবিল গড়ে উঠেছে কি না, তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া দরকার। সত্য সামনে আনতেই এফআইআর করা হয়েছে।”
Also Read | কলকাতা পুরসভার বড় সিদ্ধান্ত! সোহরাবর্দি অ্যাভিনিউর নাম বদলে এবার গোপাল মুখোপাধ্যায় রোড
চার্টার ফ্লাইটের খরচ নিয়েও প্রশ্ন
দলের অর্থ ব্যবহারের ধরন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিদ্রোহী নেতা। তাঁর অভিযোগ, সাধারণ কর্মীদের আইনি লড়াইয়ের জন্য অর্থ না থাকলেও চার্টার বিমানে যাতায়াতে বিপুল টাকা খরচ করা হয়েছে।
ঋতব্রতের দাবি, “দিল্লি যাওয়া-আসার জন্য একটি চার্টার বিমানে প্রায় ৪ থেকে ৪.৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। অথচ দলের সাধারণ কর্মীদের জন্য কোনও অর্থ নেই। এই সমস্ত আর্থিক লেনদেন অবিলম্বে তদন্তের আওতায় আনা উচিত।”
ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নিয়ে নতুন বিতর্ক
এদিকে দলের প্রাক্তন কোষাধ্যক্ষ অরূপ বিশ্বাস একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কে চিঠি দিয়ে তৃণমূলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট পরিচালনায় স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আবেদন করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, দলের নিয়ন্ত্রণ ও নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ মেটার আগে কোনও ডেবিট লেনদেন বা অ্যাকাউন্ট পরিচালনার নিয়মে পরিবর্তন করা উচিত নয়।
অন্যদিকে তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ বিদ্রোহী শিবিরের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, বহিষ্কৃত বিধায়ক সন্দীপন সাহা নির্বাচনী প্রচারের জন্য দলের অ্যাকাউন্ট থেকে ২৫ লক্ষ টাকা নিয়েছিলেন।
কুণাল ঘোষ বলেন, “দলের প্রতীক ও তহবিলের সাহায্যে জিতে আজ তারাই সেই অ্যাকাউন্টের তদন্ত চাইছেন। যদি ওই অর্থকে অবৈধ বলে মনে হয়, তাহলে প্রথমে নির্বাচন কমিশনের কাছে সেই টাকা ফেরত দিন।”
তিনি বিদ্রোহী বিধায়কদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলেও কটাক্ষ করেন এবং অভিযোগ করেন যে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির পরামর্শেই তাঁরা এই পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
Also Read | ২০২৯ র জন্য নয়া ইভিএম বানাতে ৫০০ কোটি দাবি কমিশনের! এক দেশ এক নির্বাচনের ইঙ্গিত?
কীভাবে শুরু হল সংকট?
তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংকট আরও ঘনীভূত হয় যখন বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা অভিযোগ করেন যে বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাব করে যে প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছিল, সেখানে তাঁদের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে।
এই অভিযোগের পর বিধানসভার প্রধান সচিব স্পিকারের নির্দেশে হেয়ার স্ট্রিট থানায় এফআইআর দায়ের করেন। পরে তদন্তভার দেওয়া হয় সিআইডিকে, যারা একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করেছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ান। পরবর্তীতে সেই গোষ্ঠী ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে সমর্থন জানায়।
অনিশ্চয়তার মুখে তৃণমূল
একদিকে বিদ্রোহী সাংসদদের আলাদা ব্লক গঠন, অন্যদিকে বিধায়কদের নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ, শীর্ষ নেতাদের পদত্যাগ এবং দলের আর্থিক লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন, সব মিলিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস এখন তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় সাংগঠনিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে।
আগামী দিনে এই আর্থিক বিতর্ক এবং নেতৃত্বের লড়াই কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।



