নয়াদিল্লি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ডিজিটাল পরিকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগ আকর্ষণের দৌড়ে এগিয়ে চলেছে ভারত। তবে এই গেমচেঞ্জার পরিকল্পনার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে জলবায়ু পরিবর্তন। আন্তর্জাতিক জলবায়ু ঝুঁকি বিশ্লেষণ সংস্থা এক্সডিআই (XDI)-র সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, ভারতের আগামী প্রজন্মের ডেটা সেন্টারগুলি ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ ও চরম আবহাওয়ার কারণে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
‘২০২৬ গ্লোবাল অ্যানালিসিস অব প্ল্যানড ডেটা সেন্টারস ফর ফিজিক্যাল ক্লাইমেট রিস্ক অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বিশ্বের ২,৫৯৫টি পরিকল্পিত ডেটা সেন্টারের ওপর সমীক্ষা চালানো হয়েছে। সেখানে দেখা গিয়েছে, শুধুমাত্র বিদ্যুৎ ও জলের চাহিদা নয়, বরং অতিরিক্ত তাপমাত্রা, ঝড়, বন্যা এবং বিদ্যুৎ বা পরিবহণ ব্যবস্থার ব্যাঘাতের মতো জলবায়ুজনিত ঝুঁকিও ডেটা সেন্টারগুলির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিকল্পিত ডেটা সেন্টারগুলির জলবায়ু ঝুঁকির নিরিখে ভারত বিশ্বের মধ্যে একাদশ স্থানে রয়েছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হল, দেশের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি কেন্দ্র—তামিলনাড়ু, তেলেঙ্গানা এবং কর্ণাটক—বিশ্বের শীর্ষ ৩০টি অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে, যেখানে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ডেটা সেন্টারের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ক্লাউড পরিষেবার দ্রুত বিস্তারের ফলে ভারতে ডেটা সেন্টারের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু চরম তাপমাত্রা ডেটা সেন্টারের যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে, কুলিং সিস্টেমের খরচ বাড়াতে পারে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়বে।
এক্সডিআই-এর প্রতিষ্ঠাতা ও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের প্রধান ড. কার্ল ম্যালন বলেন, “এতদিন ডেটা সেন্টারের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ও জলের ব্যবহার নিয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এখন জলবায়ুজনিত শারীরিক ঝুঁকিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রশ্ন শুধু কোথায় নতুন ডেটা সেন্টার তৈরি হবে তা নয়, বরং সেগুলি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর, বিমাযোগ্য এবং অর্থনৈতিকভাবে টেকসই থাকবে কি না, সেটাও ভাবতে হবে।”
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পূর্ব এশিয়ায় পরিকল্পিত ডেটা সেন্টারগুলির মধ্যে জলবায়ু ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ১২ শতাংশ পরিকল্পিত ডেটা সেন্টার উচ্চ ঝুঁকির আওতায় রয়েছে। উচ্চ কার্বন নির্গমন অব্যাহত থাকলে শতাব্দীর শেষে এই ঝুঁকি তিনগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডেটা সেন্টার শুধু নিজের অবকাঠামোর উপর নির্ভরশীল নয়। বিদ্যুৎ গ্রিড, টেলিকম নেটওয়ার্ক, জল সরবরাহ, পরিবহণ ব্যবস্থা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের মতো বহিরাগত পরিষেবার উপরও এগুলির কার্যক্রম নির্ভর করে। জলবায়ুজনিত দুর্যোগে এই পরিষেবাগুলির ব্যাঘাত ঘটলে ডেটা সেন্টারের কাজও বড়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে প্রতিবেদনে আশার কথাও বলা হয়েছে। পরিকল্পনার পর্যায়েই সঠিক স্থান নির্বাচন, উন্নত প্রকৌশল মানদণ্ড এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে ভবিষ্যতের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
বিশ্বজুড়ে এআই অবকাঠামো নির্মাণে যখন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হচ্ছে, তখন ভারতের জন্যও এই সতর্কবার্তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ শুধু চাহিদা বৃদ্ধির উপর নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতার উপরও নির্ভর করবে।



