মেদিনীপুরে জেলাশাসকের কার্যালয়ের সামনে চাকরিহারা শিক্ষকদের বিক্ষোভ

পশ্চিম মেদিনীপুরের মেদিনীপুর শহরের কালেক্টরেট মোড়ে শুক্রবার বিকেলে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন চাকরিহারা শিক্ষক-শিক্ষিকারা। তাঁদের দাবি, তাঁরা যোগ্য শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও আজ তাঁদের চাকরি (SSC…

Jobless Teachers Protest in Medinipur After Supreme Court Ruling!

পশ্চিম মেদিনীপুরের মেদিনীপুর শহরের কালেক্টরেট মোড়ে শুক্রবার বিকেলে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন চাকরিহারা শিক্ষক-শিক্ষিকারা। তাঁদের দাবি, তাঁরা যোগ্য শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও আজ তাঁদের চাকরি (SSC Scam) ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতির জন্য তাঁরা সরাসরি রাজ্য সরকারকে দায়ী করেছেন এবং অভিযোগ করেছেন যে তাঁরা রাজনীতির শিকার হয়েছেন। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট ২০১৬ সালের এসএসসি প্যানেলকে সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করে রাজ্যের প্রায় ২৫,৭৫২ জন শিক্ষক-শিক্ষিকার চাকরি বাতিল করেছে। এর ফলে শুক্রবার থেকে এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। দিশেহারা এই শিক্ষকরা মেদিনীপুরে জেলাশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভে নেমেছেন।

   

শুক্রবার বিকেলে কালেক্টরেট মোড়ে জড়ো হয়ে চাকরিহারা শিক্ষকরা তাঁদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁরা জেলাশাসকের দপ্তরের বাইরে অবস্থান করে সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। বিক্ষোভের এক পর্যায়ে তাঁরা প্রতীকীভাবে কালেক্টরেট মোড়ের রাস্তায় পথ অবরোধ করেন। এমনকি গাড়ির সামনে শুয়ে পড়ে তাঁরা তাঁদের প্রতিবাদ জানান। এই ঘটনায় এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষকরা জানিয়েছেন, শনিবার থেকে তাঁরা পরিবার নিয়ে আরও বৃহৎ আন্দোলনে নামবেন। তাঁদের দাবি, সরকার তাঁদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে না দিলে এই আন্দোলন আরও তীব্র হবে।

Advertisements

শিক্ষকদের অভিযোগ ও ক্ষোভ

চাকরিহারা শিক্ষকদের বক্তব্য, তাঁরা সঠিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চাকরি পেয়েছিলেন। তাঁদের যোগ্যতা এবং প্রশিক্ষণের ভিত্তিতে তাঁরা বছরের পর বছর ধরে শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে এসেছেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তাঁদের চাকরি বাতিল হওয়ায় তাঁরা আজ সম্পূর্ণ দিশেহারা। একজন শিক্ষক বলেন, “আমরা কঠোর পরিশ্রম করে পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পেয়েছিলাম। আমাদের কোনো দোষ না থাকলেও আজ আমরা রাস্তায়। এর জন্য রাজ্য সরকার এবং তাদের ভুল নীতি দায়ী। আমরা রাজনীতির শিকার হয়েছি।”

তাঁরা আরও অভিযোগ করেছেন যে এই রায়ের ফলে তাঁদের পরিবারের ওপরও মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। অনেক শিক্ষকই তাঁদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য। হঠাৎ চাকরি হারানোর ফলে তাঁদের সংসার চালানোর পথ বন্ধ হয়ে গেছে। একজন শিক্ষিকা বলেন, “আমার দুটো ছোট ছেলেমেয়ে আছে। এখন তাদের পড়াশোনা, খাওয়া-দাওয়া কীভাবে চলবে, জানি না। সরকার আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কেন এত উদাসীন?”

বিক্ষোভের চিত্র

শুক্রবার বিকেলে মেদিনীপুরের কালেক্টরেট মোড়ে শিক্ষকদের বিক্ষোভের ফলে যান চলাচল ব্যাহত হয়। তাঁরা ‘চাকরি ফিরিয়ে দাও’, ‘ন্যায় চাই’ জাতীয় স্লোগান দিয়ে জেলাশাসকের কার্যালয়ের গেটের সামনে অবস্থান করেন। কিছু শিক্ষক রাস্তায় শুয়ে পড়ে গাড়ি আটকে বিক্ষোভ দেখান। পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। তবে, শিক্ষকরা জানিয়েছেন, তাঁদের দাবি না মানা পর্যন্ত তাঁরা পিছু হটবেন না।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পটভূমি

২০১৬ সালের এসএসসি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে চলছিল। এই মামলা নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে পুরো প্যানেলটিই অবৈধ। এই রায়ের ফলে ২৫,৭৫২ জন শিক্ষক-শিক্ষিকার চাকরি বাতিল হয়েছে। রাজ্য সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে কোনো তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে পারেনি, যা শিক্ষকদের মধ্যে আরও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা

এই চাকরিহারা শিক্ষকদের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে সকলেই সংশয়ে রয়েছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, শনিবার থেকে পরিবারসহ বৃহৎ আন্দোলনে নামবেন। এই আন্দোলনে শিক্ষকদের স্ত্রী, সন্তান এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও যোগ দেবেন বলে জানা গেছে। তাঁরা সরকারের কাছে চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতিপূরণের দাবিও তুলতে পারেন।

মেদিনীপুরের একজন শিক্ষক বলেন, “আমরা শুধু চাকরি চাই না, আমাদের সম্মানও ফিরিয়ে দেওয়া হোক। আমরা অপরাধী নই, তবু আমাদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।” তাঁরা সরকারের কাছে তাৎক্ষণিক সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।

এই ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দারা শিক্ষকদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। অনেকে বলছেন, এত বড় সংখ্যক শিক্ষকের চাকরি হারানো শিক্ষা ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলবে। স্কুলগুলোতে শিক্ষকের ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি করবে। স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, “এই শিক্ষকরা আমাদের ছেলেমেয়েদের পড়িয়েছেন। তাঁদের এই অবস্থা দেখে মন খারাপ লাগছে। সরকারের উচিত এর সমাধান করা।”

মেদিনীপুরে চাকরিহারা শিক্ষকদের এই বিক্ষোভ রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সরকারি নীতির ওপর বড় প্রশ্ন তুলেছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে চাকরি বাতিল হলেও, শিক্ষকরা এই সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে প্রস্তুত নন। তাঁদের আন্দোলন কোন দিকে যায় এবং সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, তা আগামী দিনে স্পষ্ট হবে। বর্তমানে, এই শিক্ষকদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তবে তাঁরা জানিয়েছেন, ন্যায় না পাওয়া পর্যন্ত তাঁদের লড়াই চলবে।