আগামী ১ এপ্রিল থেকে কেন্দ্রীয় বাজেটে ঘোষিত বেশ কিছু নতুন আয়কর (Income Tax) নিয়ম কার্যকর হতে চলেছে, যা সরাসরি চাকরিজীবীদের বেতন, বিনিয়োগকারীদের সঞ্চয় এবং করদাতাদের ওপর প্রভাব ফেলবে। এই পরিবর্তনগুলির মধ্যে রয়েছে নতুন কর স্ল্যাব ও হার, সেকশন ৮৭এ-র অধীনে কর ছাড়ের সীমা বৃদ্ধি, TDS ও TCS নিয়মে সংশোধনী, ULIP-র ওপর কর আরোপ এবং আপডেটেড আয়কর (Income Tax) রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা বৃদ্ধি। এই পরিবর্তনগুলি কর ব্যবস্থাকে সরলীকরণের পাশাপাশি সম্মতি বাড়ানোর লক্ষ্যে এনেছে বলে সরকার জানিয়েছে। আসুন জেনে নিই এই ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সম্পর্কে বিস্তারিত।
১. TDS সীমা বৃদ্ধি:
১ এপ্রিল থেকে বিভিন্ন ধারার অধীনে TDS (ট্যাক্স ডিডাক্টেড অ্যাট সোর্স) সীমা বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য সুদের আয়ের ওপর TDS সীমা বর্তমানে ৫০,০০০ টাকা থেকে বেড়ে ১ লক্ষ টাকা হয়েছে। এর ফলে প্রবীণ নাগরিকরা তাদের সঞ্চয় থেকে অতিরিক্ত ৫০,০০০ টাকার সুদের আয়ের ওপর কোনও TDS কাটতে হবে না, যা তাঁদের জন্য স্বস্তির খবর। চাকরিজীবীদের জন্যও অন্যান্য ক্ষেত্রে TDS সীমা বৃদ্ধির ফলে বেতন থেকে কম কর কাটার সম্ভাবনা রয়েছে।
২. নতুন কর স্ল্যাব ও হার:
নতুন আয়কর (Income Tax) স্ল্যাবে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে, যা চাকরিজীবীদের করের বোঝা কিছুটা কমাতে পারে। নতুন হারগুলি হল:
০ থেকে ৪ লক্ষ টাকা – শূন্য
৪ লক্ষ থেকে ৮ লক্ষ টাকা – ৫%
৮,০০,০০১ থেকে ১২,০০,০০০ টাকা – ১০%
১২,০০,০০১ থেকে ১৬,০০,০০০ টাকা – ১৫%
১৬,০০,০০১ থেকে ২০,০০,০০০ টাকা – ২০%
২০,০০,০০১ থেকে ২৪,০০,০০০ টাকা – ২৫%
২৪ লক্ষ টাকার ওপরে – ৩০%
এই নতুন স্ল্যাবে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের চাকরিজীবীরা উপকৃত হতে পারেন, তবে উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের জন্য করের হার বেশি থাকছে।
৩. Section 87A-র অধীনে কর ছাড়:
Section 87A-র অধীনে কর ছাড়ের সীমা ২৫,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০,০০০ টাকা করা হয়েছে। এর ফলে ১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত হবে। এটি মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীদের জন্য একটি বড় স্বস্তি, কারণ তাঁরা এখন অতিরিক্ত ৩৫,০০০ টাকার কর থেকে মুক্তি পাবেন।
৪. TCS নিয়মে পরিবর্তন:
ট্যাক্স কালেক্টেড অ্যাট সোর্স (TCS) নিয়মেও আপডেট এসেছে। বিদেশ ভ্রমণ, বিনিয়োগ এবং অন্যান্য লেনদেনের ক্ষেত্রে TCS প্রযোজ্য সীমা ৭ লক্ষ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ লক্ষ টাকা করা হয়েছে। এর ফলে চাকরিজীবী ও বিনিয়োগকারীরা যাঁরা বিদেশে ভ্রমণ বা বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের জন্য কিছুটা সুবিধা হবে। তবে নতুন TCS হার সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানতে সরকারি বিজ্ঞপ্তি দেখা প্রয়োজন।
৫. আপডেটেড আয়কর রিটার্নের সময়সীমা বৃদ্ধি:
যাঁরা কোনও কারণে আয়কর (Income Tax) রিটার্ন দাখিল করতে ভুলে গেছেন, তাঁদের জন্য সুখবর। আপডেটেড আয়কর রিটার্ন (ITR-U) দাখিলের সময়সীমা ১২ মাস থেকে বাড়িয়ে ৪৮ মাস (৪ বছর) করা হয়েছে। এর ফলে করদাতারা এখন চার বছরের মধ্যে তাঁদের রিটার্ন সংশোধন করতে পারবেন, যা কর ব্যবস্থায় নমনীয়তা আনবে।
৬. ULIP-তে পরিবর্তন:
ইউনিট লিঙ্কড ইন্স্যুরেন্স প্ল্যান (ULIP)-এর ওপরও নতুন নিয়ম এসেছে। ২০২৫-এর বাজেট অনুযায়ী, যদি ULIP-র প্রিমিয়াম ২.৫ লক্ষ টাকার বেশি হয়, তবে তার থেকে প্রাপ্ত মুনাফা ক্যাপিটাল গেইনস হিসেবে বিবেচিত হবে এবং সেকশন ১১২এ-র অধীনে করযোগ্য হবে। এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন, যাঁরা ULIP-কে করমুক্ত বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে দেখতেন।
এই নতুন নিয়মগুলি চাকরিজীবীদের জন্য মিশ্র ফল বয়ে আনবে। নতুন কর স্ল্যাব ও বর্ধিত ছাড়ের ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মীরা সুবিধা পাবেন। উদাহরণস্বরূপ, ১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত হওয়ায় অনেকের হাতে বেশি টাকা থাকবে। তবে উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের জন্য ২৪ লক্ষ টাকার ওপর ৩০% করের হার অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। TDS ও TCS সীমা বৃদ্ধি বেতন ও বিনিয়োগে নমনীয়তা আনলেও, ULIP-র নতুন কর নিয়ম বিনিয়োগকারীদের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে পারে।
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনগুলি কর ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও সরল করার দিকে একটি পদক্ষেপ। তবে চাকরিজীবীদের উচিত তাঁদের আয় ও বিনিয়োগের পরিকল্পনা এখন থেকেই পুনর্বিবেচনা করা। “১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত আয় একটি বড় সুবিধা, কিন্তু উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের জন্য বিনিয়োগের বিকল্পগুলি আরও সতর্কতার সঙ্গে বেছে নিতে হবে,” বলছেন কলকাতার একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট।
১ এপ্রিল থেকে কার্যকর এই নতুন আয়কর (Income Tax) নিয়মগুলি চাকরিজীবী, বিনিয়োগকারী ও করদাতাদের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে। সঠিক পরিকল্পনা ও তথ্যের মাধ্যমে এই পরিবর্তনগুলির সুবিধা নেওয়া সম্ভব। তাই সময় থাকতে নিজের আর্থিক পরিকল্পনা ঠিক করে নিন এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।