নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে শুক্রবার রাজতন্ত্র সমর্থকদের তাণ্ডব (Nepal Political Crisis) চলেছে। তারা একটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে এবং নিরাপত্তা ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নেপাল পুলিশকে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করতে হয়েছে। এই ঘটনার মধ্যে সিপিএন-মাওবাদী কেন্দ্রের নেতা পুষ্পকমল দহল ‘প্রচণ্ড’ রাজতন্ত্রবাদী শক্তিগুলিকে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “নেপালি জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলির উদার মনোভাবকে দুর্বলতা ভেবে ভুল করবেন না।” প্রাক্তন রাজা জ্ঞানেন্দ্র শাহকেও তিনি তাঁর পুরনো ভুলগুলি পুনরাবৃত্তি না করার পরামর্শ দিয়েছেন।
তিনকুনে এলাকায় বাড়িতে আগুন, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
শুক্রবার বিক্ষোভের সময় তিনকুনে এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। রাজতন্ত্র সমর্থকরা একটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং নিরাপত্তা ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করে। বিক্ষোভকারীরা হাতে নেপালের জাতীয় পতাকা এবং প্রাক্তন রাজা জ্ঞানেন্দ্র শাহের ছবি নিয়ে ‘ভ্রষ্ট সরকার মুর্দাবাদ’ এবং ‘আমরা রাজতন্ত্র ফিরিয়ে চাই’—এমন স্লোগান দিতে থাকে। পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়, এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে আকাশে গুলি চালাতে হয়। একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, এই সংঘর্ষে একজন ব্যক্তি আহত হয়েছেন।
পুলিশের হাতে একাধিক যুবক আটক
কাঠমান্ডুতে রাজতন্ত্র সমর্থক এবং বিরোধীদের পৃথক পৃথক বিক্ষোভের কারণে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষ এড়াতে শত শত দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। বিক্ষোভকারীরা নিষিদ্ধ এলাকা নিউ বানেশ্বরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের আটকায়। নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগে বেশ কয়েকজন যুবককে পুলিশ হেফাজতে নেয়। রাজতন্ত্র সমর্থক দল রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টি (আরপিপি) সহ অন্যান্য গোষ্ঠীও এই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল।
২০০৮ থেকে রাজতন্ত্র পুনর্বহালের দাবি
উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে নেপালের রাজনৈতিক দলগুলি সংসদের ঘোষণার মাধ্যমে ২৪০ বছরের পুরনো রাজতন্ত্রের অবসান ঘটায় এবং হিন্দু রাষ্ট্রকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ, ফেডারেল, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত করে। তখন থেকে রাজতন্ত্র সমর্থকরা এর পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে আসছে। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি গণতন্ত্র দিবসে প্রাক্তন রাজা জ্ঞানেন্দ্র একটি ভিডিও বার্তায় তাঁর সমর্থনের জন্য জনগণের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন। এরপর থেকে রাজতন্ত্রের পক্ষে আন্দোলন আরও জোরদার হয়েছে।
প্রচণ্ডের সতর্কবার্তা: ‘উদারতাকে দুর্বলতা ভাববেন না’
অন্যদিকে, প্রচণ্ড ভৃকুটিমণ্ডপে একটি সমাবেশে বক্তৃতা দেন। হাজার হাজার মানুষের সামনে তিনি বলেন, “রাজতন্ত্রবাদীরা জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।” তিনি জানান, বিক্ষোভের সময় কিছু লোক কাঠমান্ডুতে বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে এবং পুলিশের উপর পাথর ছুঁড়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “নেপালি জনগণ এবং রাজনৈতিক দলগুলির উদার মনোভাবকে দুর্বলতা ভেবে ভুল করবেন না। এটা তাদের জন্য মারাত্মক হবে।”
জ্ঞানেন্দ্রকে প্রচণ্ডের পরামর্শ: ‘সাধারণ নাগরিক হয়ে ভুল করবেন না’
প্রচণ্ড প্রাক্তন রাজা জ্ঞানেন্দ্রকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, তিনি এখন একজন সাধারণ নাগরিক এবং তাঁর কোনও ভুল পদক্ষেপ তাঁর জন্য সবকিছু হারানোর কারণ হতে পারে। তিনি বলেন, “রাজতন্ত্র পুনঃস্থাপন করা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।” তিনি রাজতন্ত্র বিরোধী এবং গণতান্ত্রিক শক্তিগুলিকে আত্মসমালোচনা করে নিজেদের শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।
কাঠমান্ডুতে কারফিউ জারি
বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার কাঠমান্ডুর বানেশ্বর, তিনকুনে এবং আশপাশের এলাকায় কারফিউ জারি করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন কার্যালয় এই আদেশ জারি করেছে। প্রধান জেলা কর্মকর্তা ঋষিরাম তিওয়ারি জানিয়েছেন, কারফিউ বিকেল ৪:২৫ থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এই সময়ে কারফিউ এলাকায় চলাচল, সমাবেশ, র্যালি এবং বিক্ষোভ নিষিদ্ধ থাকবে। নিষিদ্ধ এলাকার মধ্যে গৌশালা থেকে বিমানবন্দর, গৌরিগাঁও, তিনকুনে, কোটেশ্বর, কোটেশ্বর থেকে জদিবুটি সেতু, কোটেশ্বর থেকে বালকুমারী সেতু, বানেশ্বর চক থেকে শঙ্খমূল সেতু এবং গৌশালা চক থেকে পুরানো ও নতুন বানেশ্বর চক পর্যন্ত এলাকা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিক্ষোভের পটভূমি
নেপালে রাজতন্ত্রের অবসানের পর থেকে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দুর্নীতির অভিযোগ বেড়েছে। রাজতন্ত্র সমর্থকরা দাবি করছেন যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে এবং রাজতন্ত্রই দেশের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারে। জ্ঞানেন্দ্র শাহ গত কয়েক মাসে বিভিন্ন ধর্মীয় স্থানে সফর করেছেন এবং তাঁর সমর্থনে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। তবে, প্রচণ্ডের মতো নেতারা এই আন্দোলনকে কঠোরভাবে দমন করার পক্ষে।
জনগণের প্রতিক্রিয়া
কাঠমান্ডুর বাসিন্দারা এই অরাজকতায় উদ্বিগ্ন। একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “আমরা শান্তি চাই, কিন্তু এই সংঘর্ষ আমাদের জীবনকে কঠিন করে তুলছে।” অনেকে মনে করেন, রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনা সমাধান নয়, তবে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভও কম নয়।
কাঠমান্ডুতে রাজতন্ত্র সমর্থকদের এই তাণ্ডব এবং প্রচণ্ডের সতর্কবার্তা নেপালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির জটিলতা প্রকাশ করেছে। কারফিউ জারির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চললেও, রাজতন্ত্র বনাম গণতন্ত্রের এই লড়াই শিগগিরই শেষ হবে বলে মনে হয় না। নেপালের ভবিষ্যৎ এখন জনগণ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতে।