‘মাতৃ বন্দনা যোজনা’ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ সোনিয়া গান্ধীর

কংগ্রেস সাংসদ এবং রাজ্যসভার সদস্য সোনিয়া গান্ধী (sonia gandhi) সম্প্রতি কেন্দ্র সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প—গর্ভবতী মহিলাদের জন্য মাতৃত্বকালীন সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে চালু করা প্রধানমন্ত্রী মাতৃ…

https://kolkata24x7.in/wp-content/uploads/2025/03/sonia.jpg

কংগ্রেস সাংসদ এবং রাজ্যসভার সদস্য সোনিয়া গান্ধী (sonia gandhi) সম্প্রতি কেন্দ্র সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প—গর্ভবতী মহিলাদের জন্য মাতৃত্বকালীন সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে চালু করা প্রধানমন্ত্রী মাতৃ বন্দনা যোজনা (পিএমএমভিওয়াই)—এর তহবিলের তীব্র ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি রাজ্যসভায় তাঁর বক্তৃতায় এই প্রকল্পের অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং কেন্দ্র সরকারের কাছে এর কারণ জানতে চেয়েছেন। সোনিয়া গান্ধী বলেন, এই প্রকল্পটি গর্ভবতী মহিলাদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু পর্যাপ্ত তহবিলের অভাবে এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না।

প্রশ্ন তুলে তিনি সরকারের দায়িত্বহীনতার সমালোচনা

তিনি একটি বিশ্লেষণের উল্লেখ করে জানান যে, ২০২২-২৩ সালে গর্ভবতী মহিলাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ অন্তত একটি কিস্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু পরের বছর, অর্থাৎ ২০২৩-২৪ সালে, এই হার কমে মাত্র ১২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। “এত বড় পতন কেন ঘটতে দেওয়া হলো? কেন্দ্র সরকার এর জন্য কী ব্যাখ্যা দেবে?”—এই প্রশ্ন তুলে তিনি সরকারের দায়িত্বহীনতার সমালোচনা করেন। সোনিয়া গান্ধী, যিনি সম্প্রতি রাজ্যসভায় যোগ দিয়েছেন, আরও বলেন যে, জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা আইন (এনএফএসএ) অনুযায়ী মাতৃত্বকালীন সুবিধার পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য বছরে প্রায় ১২,০০০ কোটি টাকার বাজেট প্রয়োজন। কিন্তু চলতি বছরের বাজেটে পিএমএমভিওয়াই-এর জন্য আলাদা করে কোনও তহবিল বরাদ্দের উল্লেখ নেই।

   

তিনি বাজেটের নথির উল্লেখ করে বলেন, “বাজেটে শুধু জানানো হয়েছে যে মহিলা ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘সমর্থ্য’ নামে একটি প্রকল্প রয়েছে। এই প্রকল্পের পাঁচটি উপাদানের মধ্যে পিএমএমভিওয়াই একটি। ২০২৫-২৬ সালের জন্য সমর্থ্যের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে মাত্র ২,৫২১ কোটি টাকা। এটি স্পষ্ট যে পিএমএমভিওয়াই-এর জন্য তহবিলের তীব্র ঘাটতি রয়েছে, যা সংসদে পাস করা আইনের লঙ্ঘন।” তাঁর এই বক্তব্যে সরকারের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে বিরাট ফারাক রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

Advertisements

প্রধানমন্ত্রী মাতৃ বন্দনা যোজনা

 

প্রধানমন্ত্রী মাতৃ বন্দনা যোজনা ২০১৭ সালে চালু হয়েছিল। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মহিলাদের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করা, যাতে তারা প্রসবের আগে ও পরে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে পারেন এবং তাদের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে। এই প্রকল্পে প্রথম সন্তানের জন্য ৫,০০০ টাকা তিনটি কিস্তিতে দেওয়ার কথা। এছাড়া, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের পর জননী সুরক্ষা যোজনার (জেএসওয়াই) আওতায় আরও ১,০০০ টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে, যাতে গড়ে একজন মহিলা ৬,০০০ টাকা পান। কিন্তু সোনিয়া গান্ধীর অভিযোগ, তহবিলের অভাবে এই প্রকল্পটি তার উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে।

ভারতে মাতৃমৃত্যুর হার এখনও উদ্বেগজনক। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ৬৭,০০০ মহিলা প্রসবের সময় মারা যান। এছাড়া, প্রসবের এক মাসের মধ্যে ৯ লক্ষ নবজাতকের মৃত্যু ঘটে। এই পরিস্থিতিতে গর্ভবতী মহিলাদের জন্য আর্থিক ও চিকিৎসা সহায়তা অত্যন্ত জরুরি। সোনিয়া গান্ধী বলেন, “এই প্রকল্পটি মাতৃ ও শিশুমৃত্যু কমাতে সাহায্য করতে পারত। কিন্তু তহবিলের অভাবে এটি কার্যকরভাবে কাজ করছে না।”

জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা আইন

 

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা আইন, ২০১৩-এর অধীনে গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মহিলাদের ৬,০০০ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কেন্দ্র সরকার এই প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। “এনএফএসএ-র এই বিধান বাস্তবায়নের জন্য যথেষ্ট তহবিল বরাদ্দ করা হয়নি। এটি আইনের প্রতি অবহেলা,” তিনি অভিযোগ করেন।

আরো দেখুন ‘নারীর স্তন চেপে ধরা ধর্ষণের চেষ্টা নয়’, হাই কোর্টের বিতর্কিত রায়ে স্থগিতাদেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট

সোনিয়া গান্ধীর এই বক্তব্যে সরকারের নীতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে অসঙ্গতি তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, “যে প্রকল্পগুলি মহিলাদের জীবন বাঁচাতে পারে, সেগুলোর জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না করা দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।” তাঁর মতে, এই তহবিলের ঘাটতি কেবল গর্ভবতী মহিলাদেরই ক্ষতি করছে না, বরং দেশের ভবিষ্যত প্রজন্মের উপরও প্রভাব ফেলছে।

এই প্রসঙ্গে তিনি সরকারের কাছে প্রশ্ন রেখেছেন, “কেন এই প্রকল্পের তহবিল কমানো হলো? কেন গর্ভবতী মহিলাদের প্রতি এই উদাসীনতা?” তিনি আরও বলেন, “আমরা যদি আমাদের মায়েদের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্ন না নিই, তবে আমাদের ভবিষ্যত কী হবে?” তাঁর এই বক্তব্যে স্পষ্ট যে, তিনি এই বিষয়টিকে কেবল রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে নয়, বরং একটি জাতীয় সংকট হিসেবে দেখছেন।

সামাজিক মাধ্যমে তাঁর এই বক্তব্য ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। অনেকে তাঁর সঙ্গে একমত পোষণ করে বলছেন যে, গর্ভবতী মহিলাদের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা দেওয়া সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, এটি কংগ্রেসের রাজনৈতিক কৌশল। তবে, সোনিয়া গান্ধীর এই মন্তব্য সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

এই ঘটনা ভারতে মাতৃস্বাস্থ্য নিয়ে চলমান সমস্যাকে আরও একবার সামনে এনেছে। সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি। তবে, এই বিষয়টি সংসদে আরও আলোচনার জন্ম দিতে পারে। সোনিয়া গান্ধীর এই সমালোচনা গর্ভবতী মহিলাদের জন্য কেন্দ্রীয় প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।