প্রযুক্তি জায়ান্ট আইবিএমে ৯,০০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা চুড়ান্ত

বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তি জায়ান্ট ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস মেশিনস কর্পোরেশন (IBM ), যারা ‘বিগ ব্লু’ নামে পরিচিত, আমেরিকার বিভিন্ন অবস্থানে হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করছে বলে…

IBM Layoffs

বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তি জায়ান্ট ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস মেশিনস কর্পোরেশন (IBM ), যারা ‘বিগ ব্লু’ নামে পরিচিত, আমেরিকার বিভিন্ন অবস্থানে হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করছে বলে খবর। ‘দ্য রেজিস্টার’ নামক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ছাঁটাইয়ে প্রায় ৯,০০০ কর্মী প্রভাবিত হতে পারেন। এই ছাঁটাইয়ের সবচেয়ে বড় ধাক্কা পড়বে আইবিএম-এর ক্লাউড ক্লাসিক বিভাগে। তবে, আইবিএমের তরফে এখনও এই ছাঁটাইয়ের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চিতকরণ দেওয়া হয়নি।

Also Read | H-1B visa প্রোগ্রামে বড় জয় ভারতীয় আইটি ফার্মের: ইনফোসিস, টিসিএস নাকি এইচসিএল? 

   

একটি সূত্র ‘দ্য রেজিস্টার’-কে জানিয়েছে, “সঠিক সংখ্যাটি গোপন রাখা হচ্ছে, তবে এটি হাজারে হাজারে।” আইবিএম-এর প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (CFO) জেমস কাভানা গত জানুয়ারিতে বলেছিলেন যে, কোম্পানি “পূর্ববর্তী বছরগুলোর মতোই কর্মীবাহিনী পুনর্গঠনের” পরিকল্পনা করছে। এই ঘোষণা প্রযুক্তি জগতে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, বিশেষ করে বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যে, যারা প্রযুক্তি শিল্পে ভারতের ভূমিকার প্রতি আগ্রহী।

Advertisements

আমেরিকার একাধিক শহরে ছাঁটাই
আইবিএম-এর এই ছাঁটাই ডালাস, নিউ ইয়র্ক, র‍্যালি এবং ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন অবস্থানে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরামর্শ (কনসাল্টিং), ক্লাউড অবকাঠামো, কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা, অভ্যন্তরীণ আইটি এবং বিক্রয় বিভাগের কর্মীরা এতে প্রভাবিত হচ্ছেন। সূত্র জানিয়েছে, কিছু কর্মী ব্যক্তিগত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তাদের চাকরি হারানোর খবর পেয়েছেন, আবার কেউ কেউ অভ্যন্তরীণ সভায় এই তথ্য জেনেছেন। এই খবরে প্রযুক্তি শিল্পে কর্মরত বাঙালি পেশাদারদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, যারা আইবিএম-এর মতো বহুজাতিক কোম্পানির গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।

ক্লাউড ক্লাসিক বিভাগে বড় ধাক্কা
আইবিএম-এর ক্লাউড ক্লাসিক বিভাগ, যা ২০১৩ সালে সফটলেয়ার অধিগ্রহণের মাধ্যমে গড়ে উঠেছিল, এই ছাঁটাইয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই বিভাগে প্রায় ২৫ শতাংশ কর্মী তাদের চাকরি হারাতে পারেন। ক্লাউড ক্লাসিক বেয়ার মেটাল সার্ভার, ভার্চুয়াল সার্ভার এবং স্টোরেজের মতো পরিষেবা প্রদান করে। তবে, আইবিএম-এর নতুন এবং উন্নত ক্লাউড প্ল্যাটফর্ম, আইবিএম ক্লাউড ভিপিসি, এর উন্নত হার্ডওয়্যার, নেটওয়ার্ক পারফরম্যান্স এবং নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যের কারণে ক্লাউড ক্লাসিককে ছাপিয়ে গেছে। এই কারণে ক্লাউড ক্লাসিক বিভাগের আকার ছোট করা আইবিএম-এর পুনর্গঠন পরিকল্পনার একটি যৌক্তিক পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।

পুনর্গঠন ও অফশোর চাকরির দিকে ঝোঁক
সূত্রের মতে, এই ছাঁটাই আইবিএম-এর চলমান পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ, যার মধ্যে রয়েছে কম খরচের অঞ্চলে চাকরি স্থানান্তর, বিশেষ করে ভারতে। কোম্পানি তার কার্যক্রমকে সুবিন্যস্ত করার চেষ্টা করছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং নতুন অধিগ্রহণে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। ভারতের বেঙ্গালুরু, হায়দ্রাবাদ, পুনে এবং চেন্নাইয়ের মতো শহরে আইবিএম-এর ইতিমধ্যেই উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। এই ছাঁটাইয়ের ফলে ভারতে নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হতে পারে, যা বাঙালি তরুণ প্রযুক্তি পেশাদারদের জন্য একটি সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। তবে, আমেরিকায় কর্মরত ভারতীয়দের জন্য এটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভবিষ্যৎ ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা
AI-এ ক্রমাগত বিনিয়োগ এবং কম খরচের অঞ্চলে শ্রম স্থানান্তরের কারণে শিল্প বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আইবিএম-এর এই পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ভবিষ্যতে আরও চাকরি কাটছাঁট হতে পারে। কোম্পানি প্রযুক্তির পরিবর্তিত প্রবণতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে এই পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে, আইবিএম আনুষ্ঠানিকভাবে ছাঁটাইয়ের সংখ্যা বা কোন কোন ব্যবসায়িক ইউনিট প্রভাবিত হচ্ছে, তা নিশ্চিত করেনি। সূত্র জানিয়েছে, এটি প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য আইবিএম-এর একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।

আইবিএম সম্পর্কে
আইবিএম বা ‘বিগ ব্লু’ নিউ ইয়র্কের আরমঙ্কে অবস্থিত একটি বহুজাতিক প্রযুক্তি সংস্থা। ১৯১১ সালে কম্পিউটিং-ট্যাবুলেটিং-রেকর্ডিং কোম্পানি (CTR) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটি ১৯২৪ সালে আইবিএম নাম গ্রহণ করে। বিশ্বের ১৭০টির বেশি দেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী আইবিএম তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নাম।

আইবিএম তার হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার পণ্যের জন্য বিখ্যাত, যার মধ্যে রয়েছে পিসি, সার্ভার, স্টোরেজ সিস্টেম এবং নেটওয়ার্কিং ডিভাইস। এছাড়া, এটি পরামর্শ, প্রযুক্তি এবং ব্যবসায়িক পরিষেবা যেমন ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রদান করে। আইবিএম-এর গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম প্রথম প্রোগ্রামেবল কম্পিউটার, প্রথম হার্ড ড্রাইভ এবং প্রথম কম্পিউটার ভাইরাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এনে দিয়েছে।

বাঙালি প্রেক্ষাপট
ভারতে আইবিএম-এর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি বাঙালি তরুণদের জন্য একটি বড় সুযোগ। কলকাতা এবং অন্যান্য শহরে প্রযুক্তি শিল্পে কাজ করা অনেকে আইবিএম-এর এই পদক্ষেপকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। একজন কলকাতার প্রযুক্তি পেশাদার বলেন, “ভারতে চাকরি স্থানান্তর আমাদের জন্য ভালো খবর, কিন্তু আমেরিকায় কর্মরত ভারতীয়দের জন্য এটি উদ্বেগের।” অন্যদিকে, কেউ কেউ মনে করেন, এটি AI-এর মতো নতুন ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের গুরুত্ব তুলে ধরছে।

সমালোচনা ও ভবিষ্যৎ
এই ছাঁটাইয়ের ফলে আইবিএম-এর আমেরিকান কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, কেন কোম্পানি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বেতন বাড়াচ্ছে, অথচ কর্মী ছাঁটাই করছে। তবে, শিল্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে এই ধরনের পদক্ষেপ অনিবার্য। ভারতের জন্য এটি একটি সম্ভাবনা হলেও, দীর্ঘমেয়াদে আইবিএম-এর এই কৌশল কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলবে।