দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল মঞ্চে ভারত ও বাংলাদেশের (India vs Bangladesh) প্রতিদ্বন্দ্বিতা দীর্ঘদিনের। আগামী ২৫ মার্চ শিলংয়ের জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে এএফসি এশিয়ান কাপ ২০২৭-এর বাছাইপর্বে মুখোমুখি হতে চলেছে এই দুই প্রতিবেশী দেশ। ভারতীয় ফুটবল দল, যিনি ‘ব্লু টাইগার্স’ নামে পরিচিত, এই ম্যাচে তাদের প্রধান কোচ মানোলো মার্কেজের অধীনে প্রথম জয়ের স্বাদ পাওয়ার পর আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। গত মঙ্গলবার মালদ্বীপের বিরুদ্ধে ৩-০ গোলে জয়ের মাধ্যমে মার্কেজ তাঁর প্রথম সাফল্য অর্জন করেছেন। এই ম্যাচে সুনীল ছেত্রী তাঁর ৯৫তম আন্তর্জাতিক গোলটি করেন, যা দলের মনোবল আরও বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ দল, যারা ‘বেঙ্গল টাইগার্স’ নামে পরিচিত, তাদের নতুন তারকা হামজা চৌধুরীর জন্য উৎসাহী। শেফিল্ড ইউনাইটেডের এই মিডফিল্ডার প্রথমবার বাংলাদেশের জার্সিতে মাঠে নামবেন। এই ম্যাচটি শুধু একটি খেলা নয়, বরং দুই দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি লড়াই, কারণ এএফসি এশিয়ান কাপে জায়গা করে নেওয়ার জন্য গ্রুপ সি-তে শীর্ষে থাকতে হবে।
ভারত ও বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল ১৯৭৮ সালের ১৪ ডিসেম্বর, এশিয়ান গেমসে। সেই ম্যাচে ভারত ৩-০ গোলে জয়ী হয় এবং তারপর থেকে টানা আটটি ম্যাচে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপরাজিত ছিল। বাংলাদেশ তাদের প্রথম জয় পায় ১৯৯১ সালের ২৬ ডিসেম্বর, দক্ষিণ এশিয়ান ফেডারেশন গেমসে, যেখানে তারা ২-১ গোলে ভারতকে হারায়। তবে ভারতের সাম্প্রতিকতম পরাজয় আসে ২০০৩ সালের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফাইনালে। ৯০ মিনিটে ১-১ সমতায় শেষ হওয়া সেই ম্যাচে মতিউর রহমান মুন্না অতিরিক্ত সময়ে গোল্ডেন গোল করে বাংলাদেশকে ২-১ জয় এনে দেন। এই জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেই বছর তাদের একমাত্র সাফ শিরোপা জিতেছিল।
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে দুই দলের ১০টি মুখোমুখি লড়াইয়ের মধ্যে দুটি ফাইনালে ভারত জয়ী হয়েছে—১৯৯৯ এবং ২০০৫ সালে। দুটি ম্যাচেই ভারত ২-০ গোলে জিতেছে। সাম্প্রতিক সময়ে, ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে দুই দলের দেখা হয়। কলকাতার সল্টলেক স্টেডিয়ামে খেলা ১-১ ড্র হয়, কিন্তু বিপরীত ম্যাচে ভারত ২-০ গোলে জয়ী হয়। সর্বশেষ ২০২১ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে দুই দলের ম্যাচটি ১-১ ড্র-তে শেষ হয়।
হেড-টু-হেড রেকর্ড
দুই দেশের মধ্যে এখনও পর্যন্ত ৩১টি ম্যাচ খেলা হয়েছে। এর মধ্যে ভারত ১৬টিতে জয়ী হয়েছে, বাংলাদেশ ৩টিতে, এবং ১২টি ম্যাচ ড্র হয়েছে। এই পরিসংখ্যানে ভারতের আধিপত্য স্পষ্ট, তবে ড্র-এর সংখ্যা দেখায় যে বাংলাদেশও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পিছপা হয়নি। বর্তমান ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ভারত ১২৬তম স্থানে থাকলেও বাংলাদেশ ১৮৫তম স্থানে রয়েছে। তবে হামজা চৌধুরীর মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের আগমন বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা।
এই ম্যাচটি এএফসি এশিয়ান কাপ ২০২৭-এর বাছাইপর্বে ভারতের প্রথম ধাপ। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ব্যর্থতার পর মানোলো মার্কেজের দল এখন এশিয়ান কাপে টানা তৃতীয়বারের মতো জায়গা করে নেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে। গ্রুপ সি-তে ভারতের সঙ্গে রয়েছে বাংলাদেশ, হংকং এবং সিঙ্গাপুর। এই গ্রুপ থেকে শুধুমাত্র শীর্ষ দলই সৌদি আরবে অনুষ্ঠিতব্য এশিয়ান কাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে।
মার্কেজ বলেছেন, “মালদ্বীপের বিরুদ্ধে জয় আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এই ম্যাচটি আমাদের বাছাইপর্বের সুর নির্ধারণ করবে। আমাদের গ্রুপে শীর্ষে থাকতে হবে।” বাংলাদেশের পর ভারত জুনে হংকংয়ের মুখোমুখি হবে এবং অক্টোবরে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে খেলবে। প্রতিটি ম্যাচে পয়েন্ট অর্জন গুরুত্বপূর্ণ হবে, এবং শিলংয়ে প্রথম ম্যাচে জয় দিয়ে শুরু করা ভারতের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশের জন্য এই ম্যাচটি তাদের শক্তি প্রমাণের একটি সুযোগ। হামজা চৌধুরী, যিনি ইংল্যান্ডের আন্ডার-২১ দলের হয়ে খেলেছেন, তাঁর মায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য যোগ্যতা অর্জন করেছেন। তাঁর আগমন দলের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা এনেছে। বাংলাদেশের সমর্থকরা আশা করছেন যে, তিনি মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ আনবেন এবং ভারতের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম হবেন।
মালদ্বীপের বিরুদ্ধে ৩-০ জয়ে সুনীল ছেত্রী ছাড়াও অন্যান্য খেলোয়াড়দের অবদান উল্লেখযোগ্য ছিল। মার্কেজের কৌশল এবং দলের আক্রমণাত্মক খেলা ভারতকে গ্রুপে ফেভারিট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে ড্র-এর ইতিহাস ভারতকে সতর্ক থাকতে বাধ্য করছে।
শিলংয়ে এই ম্যাচটি ভারতীয় সমর্থকদের জন্য একটি উৎসব হয়ে উঠবে। বাঙালি ফুটবলপ্রেমীরা, যারা সাধারণত কলকাতা নাইট রাইডার্সের মতো দলের জন্য উচ্ছ্বসিত হন, এই ম্যাচে ভারতের জয়ের আশা করছেন। একই সঙ্গে, বাংলাদেশের সমর্থকরা হামজার অভিষেকে উৎফুল্ল।
ভারত ও বাংলাদেশের এই লড়াই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়, বরং দুই প্রতিবেশীর গর্ব ও প্রতিষ্ঠার লড়াই। ঐতিহাসিকভাবে ভারত এগিয়ে থাকলেও, বাংলাদেশের নতুন শক্তি এই ম্যাচকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলেছে। ২৫ মার্চ রাত ৭:০০ টায় শিলংয়ে যে দলই জিতুক, ফুটবলপ্রেমীরা একটি দারুণ লড়াই দেখতে পাবেন।