সামনেই শিবরাত্রি (Maha shivratri)। হিন্দু ধর্ম মতে সর্বোচ্চ দেবতা শিব। তিনি সৃষ্টি,স্থিতি এবং প্রলয়ের কারণ। ভারতে বহু শিবের মন্দির রয়েছে। তবে জানেন কি, এর মধ্যে পাঁচটি শিব মন্দির রয়েছে একই সরলরেখায়। কেদারনাথ ও রামেশ্বরম মন্দিরের মধ্যে একটি বিশেষ সংযোগ রয়েছে। যা ভারতীয় ধর্মীয় বিশ্বাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই দুটি মন্দিরই (Maha shivratri) মহাদেব শিবের উদ্দেশ্যে নিবেদিত। এদের মধ্যে একটি সোজা সম্পর্ক রয়েছে দ্রাঘিমাংশ রেখার মাধ্যমে। দেশের উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তের এই দুটি মন্দিরই জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে অন্যতম। কেদারনাথ এবং রামেশ্বরম দুটি দ্রাঘিমাংশ রেখায় ৭৯ ডিগ্রিতে অবস্থিত। যা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান হিসেবে পরিচিত।
এই দুটি মন্দিরের মাঝে সরলরেখায় আরও পাঁচটি শিবমন্দির অবস্থিত। এই সাতটি মন্দির একে অপরকে সংযুক্ত করে। প্রতিটি মন্দিরের মধ্যে এক একটি বিশেষ উপাদানের প্রতিনিধিত্ব করে। এই উপাদানগুলি হল ক্ষিতি (মাটি), অপ (জল), তেজ (আগুন), মরূত (বাতাস) ও ব্যোম (আকাশ)। এই পাঁচটি উপাদান বা পঞ্চভূত শিবের পূজায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
কেদারনাথ মন্দির: কেদারনাথ মন্দির উত্তরাখণ্ডের রুদ্রপ্রয়াগ জেলায় অবস্থিত এবং এটি দ্রাঘিমাংশ রেখায় ৭৯.০৬৬৯ ডিগ্রিতে রয়েছে। এটি অর্ধজ্যোতির্লিঙ্গ হিসেবে পরিচিত, যার অপর অর্ধেক নেপালের পশুপতিনাথ মন্দিরে অবস্থিত। মহাভারতের যুগে পাণ্ডবরা এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। পরবর্তীতে, আদিশংকরাচার্য মন্দিরটি পুনঃনির্মাণ করেন।
শ্রীকালহস্তী মন্দির: অন্ধ্রপ্রদেশের চিত্তোর জেলার শ্রীকালহস্তী মন্দির দ্রাঘিমাংশ রেখায় ৭৯.৬৯৮৩ ডিগ্রিতে অবস্থিত। এটি শিবের পূজার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এখানে জলকে শিবের পুজার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
একামবেশ্বরনাথ মন্দির: এটি দ্রাঘিমাংশ রেখায় ৭৯.৪২০০ ডিগ্রিতে অবস্থিত। পল্লব রাজা এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন এবং পরবর্তীতে চোল বংশ ও বিজয়নগরের রাজারা মন্দিরটির উন্নয়ন করেন। এখানে শিবকে জুঁই ফুলের তেল দিয়ে পুজো করা হয়। এটি একটি বিশেষ ঐতিহ্য।
অরুণাচলেশ্বর মন্দিরঃ অরুণাচলেশ্বর মন্দির চোলবংশী রাজাদের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। এটি দ্রাঘিমাংশ রেখায় ৭৯.০৬৭৭ ডিগ্রিতে অবস্থিত। এই মন্দিরটি বাতাসের প্রতিনিধিত্ব করে এবং শিবের পুজার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
জম্বুকেশ্বর মন্দির: জম্বুকেশ্বর মন্দির ১৮০০ বছরের পুরনো এবং এটি দক্ষিণ ভারতের অন্যতম প্রাচীন শিব মন্দির। এখানে সবসময় জল প্রবাহিত হয়, যা শিবের পবিত্রতা ও শক্তির প্রকাশ।
থিল্লাই নটরাজ মন্দির: থিল্লাই নটরাজ মন্দিরে মহাদেবের নটরাজ রূপের পূজা করা হয়। এই মন্দিরে মহাদেবের নৃত্যরত ১০৮টি পুরনো ছবি রয়েছে, যা শিবের নৃত্যশক্তি ও সৃষ্টির একটি বিশেষ চিহ্ন।
রামেশ্বরম মন্দির: রামেশ্বরম মন্দির তামিলনাড়ুর একটি ঐতিহ্যবাহী মন্দির যা শিবের এক গুরুত্বপূর্ণ জ্যোতির্লিঙ্গ। এটি সীতাকে উদ্ধারের জন্য লঙ্কা অভিযানে যাওয়ার আগে রামচন্দ্র স্থাপন করেছিলেন। এই মন্দিরটি দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে অন্যতম এবং অত্যন্ত পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত।
এই সাতটি শিবমন্দির যে সরলরেখায় অবস্থিত তা একটি আশ্চর্যজনক ধর্মীয় বিজ্ঞান হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রায় ৪০০০ বছর আগে এই মন্দিরগুলি নির্মাণ করা হয়েছিল, তখন স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ছিল না। তবে, পুরাতন গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাহায্যে, সঠিকভাবে দেশের দুই প্রান্তকে একত্রিত করে এই মন্দিরগুলি নির্মাণ করা হয়েছিল।
এই মন্দিরগুলির মধ্যে প্রতিটি শিবমন্দিরের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে এবং এটি শিবের বিভিন্ন রূপের পূজা, শক্তি এবং পঞ্চভূতের উপাসনা অনুসরণ করে। এই মন্দিরগুলি ভারতীয় ধর্মীয় সংস্কৃতির একটি অপরিহার্য অংশ, যা হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্য ও বিশ্বাসকে তুলে ধরে।