বাংলাদেশে বিদ্বেষের বিষে ভারতের লক্ষ্মীলাভ

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের (India) একের পর এক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) ও বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (CEPA) শুধু দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য মানচিত্র বদলে দিচ্ছে না,…

india-gains-trade-advantage-amid-bangladesh-economic-instability

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের (India) একের পর এক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) ও বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (CEPA) শুধু দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য মানচিত্র বদলে দিচ্ছে না, বরং তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের রপ্তানি নির্ভর অর্থনীতির উপর। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে, যেখান থেকে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে, সেখানে এই পরিবর্তন কার্যত অশনিসংকেত হয়ে উঠছে।

Advertisements

২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারত ও ওমান-এর মধ্যে স্বাক্ষরিত CEPA অনুযায়ী প্রায় ৯৯ শতাংশ ভারতীয় পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হয়েছে। এর কয়েক দিনের মধ্যেই ভারত–নিউজিল্যান্ড FTA চূড়ান্ত হয়, যেখানে ভারতীয় পণ্যের জন্য কার্যত শূন্য শুল্কের দরজা খুলে যায়। এই দুই দেশই শুধু নিজেদের বাজার নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক গেটওয়ে। ঠিক এই বাজারগুলিতেই দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল ও চামড়াজাত পণ্যের শক্ত অবস্থান ছিল।

   

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নতুন চুক্তিগুলির ফলে ভারতীয় পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য কম শুল্কে কিংবা শুল্কছাড়াই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, উপসাগরীয় দেশ এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রবেশ করতে পারবে। ফলে দাম ও সরবরাহের দিক থেকে ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশের তুলনায় আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে ‘লো কস্ট + স্টেবল সাপ্লাই চেইন’ মানেই এখন ভারত।

পরিসংখ্যান এই আশঙ্কাকেই জোরালো করছে। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার জেরে বাংলাদেশের মার্কিন বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রায় ০.৪৬ শতাংশ কমে যায়। একই সময়ে ভারতের রপ্তানি বেড়েছে ৪.২৫ শতাংশেরও বেশি। ২০২৫ সালের এপ্রিল-জুলাই সময়কালে ভারতের টেক্সটাইল ও পোশাক রপ্তানি দাঁড়ায় প্রায় ১২.১৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩.৮৭ শতাংশ বেশি। শিল্পমহলের একাংশের অনুমান, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশের অন্তত ১০–১৫ শতাংশ পোশাক অর্ডার ভারতে সরে যেতে পারে।

এদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ২০২৪ সালের গণঅস্থিরতা, শ্রম অসন্তোষ এবং নির্বাচন ঘিরে টানাপোড়েন আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মনে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। সোশ্যাল মিডিয়া ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বারবার উঠে আসছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার ছবি, যেখানে একদিকে শিল্প বন্ধের খবর, অন্যদিকে নেতৃত্বের মুখে উৎকণ্ঠার ছাপ—যার সঙ্গে প্রায়শই জুড়ে দেওয়া হচ্ছে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-র বিষণ্ণ মুখের প্রতীকী চিত্র। এই আবহে ভারত নিজেদের ‘স্থিতিশীল গণতন্ত্র ও নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন কেন্দ্র’ হিসেবে তুলে ধরতে সফল হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু শুল্কছাড় নয়—ভারতের লাভের পেছনে রয়েছে সরকারি প্রণোদনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, বন্দর ও লজিস্টিক সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য কূটনীতি। অন্যদিকে বাংলাদেশ এখনও বড় কোনও নতুন FTA বা CEPA সই করতে পারেনি। এলডিসি (LDC) থেকে উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের শুল্কছাড় হারানোর আশঙ্কাও সামনে।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের সামনে এখন দু’টি বড় চ্যালেঞ্জ—একদিকে দ্রুত নতুন বাণিজ্য চুক্তি সই করা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শ্রম পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা। তা না হলে বিদ্বেষ, অস্থিরতা ও রাজনৈতিক বিষক্রিয়ার মধ্যেই ভারত তার বাণিজ্যিক লক্ষ্মীলাভ অব্যাহত রাখবে, আর বাংলাদেশ ধীরে ধীরে হারাতে পারে তার সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক অস্ত্র—তৈরি পোশাক শিল্পের বৈশ্বিক বাজার।

Advertisements