স্পোর্টস ডেস্ক, কলকাতা: বসিরহাটের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে মিঠুন কর (Mithun Kar ) শুধুই একজন স্ট্রাইকার নন, তিনি লড়াইয়ের আর এক নাম। মাঠে গোল করার ক্ষমতার জন্য পরিচিত এই ফুটবলার গত ছয় মাস ধরে ফুটবল থেকে দূরে ছিলেন। কারণ, হাঁটুর গুরুতর এসিএল (অ্যান্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট) চোট। যে চোট বহু ফুটবলারের কেরিয়ার থামিয়ে দিয়েছে, সেই চোটকেই হার মানিয়ে আবারও মাঠে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন উত্তর ২৪ পরগনার এই ফুটবলার। আসন্ন সিএফএল ২০২৬-এ সার্দান সমিতির জার্সিতে তাঁকে দেখা যাবে বলে আশাবাদী ক্লাব কর্তারা।
গত বছরের শেষ দিকে একটি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে চোট পান মিঠুন। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারের সঙ্গে বলের দখল নিতে গিয়ে হঠাৎই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। প্রথমে চোটের গুরুত্ব বোঝা না গেলেও পরে এমআরআই রিপোর্টে ধরা পড়ে এসিএল ছিঁড়ে গিয়েছে। চিকিৎসকদের স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, অস্ত্রোপচার এবং দীর্ঘ পুনর্বাসন ছাড়া মাঠে ফেরা সম্ভব নয়।
চোটের খবর পাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই ভেঙে পড়েছিলেন মিঠুন। ফুটবলই তাঁর জীবন। ছোটবেলা থেকে বসিরহাটের বিভিন্ন মাঠে খেলতে খেলতে বড় হওয়া এই স্ট্রাইকারের কাছে ছয় মাস মাঠের বাইরে থাকা ছিল মানসিকভাবে অত্যন্ত কঠিন। যখন সতীর্থরা অনুশীলন করেছেন, ম্যাচ খেলেছেন, তখন তাঁকে কাটাতে হয়েছে হাসপাতাল, জিমনেসিয়াম এবং ফিজিওথেরাপি সেন্টারে।
মিঠুন বলেন, “চোটের খবরটা প্রথম শুনে মনে হয়েছিল সব শেষ হয়ে গেল। একজন স্ট্রাইকার হিসেবে ছন্দ হারিয়ে ফেলব কিনা, সেটাই সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল। কিন্তু পরিবার, কোচ এবং ক্লাবের কর্মকর্তারা সবসময় পাশে ছিলেন। ওদের সমর্থন না পেলে এত তাড়াতাড়ি ফিরে আসার কথা ভাবতেই পারতাম না।”
অস্ত্রোপচারের পর শুরু হয় দীর্ঘ পুনর্বাসন প্রক্রিয়া। প্রথম কয়েক সপ্তাহ ছিল সবচেয়ে কঠিন। হাঁটাচলা থেকে শুরু করে পেশির শক্তি ফেরানো—প্রতিটি ধাপই ছিল চ্যালেঞ্জে ভরা। ধীরে ধীরে ফিজিওথেরাপিস্টদের তত্ত্বাবধানে দৌড়, বল নিয়ন্ত্রণ এবং ম্যাচ পরিস্থিতির অনুশীলন শুরু করেন তিনি। প্রতিদিনের ছোট ছোট উন্নতিই তাঁকে নতুন করে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
সার্দান সমিতির কোচিং স্টাফের মতে, মিঠুনের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর মানসিক দৃঢ়তা। অনেক ফুটবলার এমন চোটের পর আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু মিঠুন বরাবরই বিশ্বাস রেখেছেন যে তিনি আবারও মাঠে ফিরবেন। ক্লাবের এক কর্মকর্তা জানান, “চোট পাওয়ার পরও ও কখনও হাল ছাড়েনি। অনুশীলনে না থাকলেও নিয়মিত দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। এখন ওকে দেখে মনে হচ্ছে আগের চেয়েও বেশি ফিট এবং আত্মবিশ্বাসী।”
বসিরহাট অঞ্চলে ফুটবলের জনপ্রিয়তা দীর্ঘদিনের। সেখানকার বহু তরুণ ফুটবলার মিঠুনকে আদর্শ হিসেবে দেখেন। তাই তাঁর প্রত্যাবর্তনের গল্প শুধু একটি ব্যক্তিগত সংগ্রামের কাহিনি নয়, বরং এলাকার তরুণদের কাছেও অনুপ্রেরণার উৎস। কঠিন সময়ে কীভাবে ধৈর্য এবং পরিশ্রম দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো যায়, তার বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছেন তিনি।
সিএফএল ২০২৬-কে সামনে রেখে ইতিমধ্যেই দলের সঙ্গে পূর্ণমাত্রায় অনুশীলন শুরু করেছেন মিঠুন। প্র্যাকটিস ম্যাচেও ধীরে ধীরে নিজের ছন্দ ফিরে পাচ্ছেন। গোল করার প্রবৃত্তি এবং বক্সের মধ্যে তাঁর উপস্থিতি এখনও প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের জন্য বড় চিন্তার কারণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন ফুটবল বিশেষজ্ঞরা।
মিঠুন অবশ্য ব্যক্তিগত লক্ষ্য নিয়ে বেশি ভাবতে নারাজ। তাঁর কথায়, “প্রথম লক্ষ্য পুরোপুরি ফিট থাকা। তারপর দলের জন্য সেরাটা দেওয়া। গোল করলে অবশ্যই ভালো লাগবে, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল সার্দান সমিতির সাফল্য। ক্লাব আমার কঠিন সময়ে পাশে ছিল, এখন মাঠে পারফরম্যান্স দিয়ে সেই ঋণ শোধ করতে চাই।”
আসন্ন সিএফএল মরশুমে সার্দান সমিতির আক্রমণভাগে তাই অন্যতম বড় অস্ত্র হতে চলেছেন মিঠুন কর। ছয় মাসের কঠিন লড়াই, অস্ত্রোপচার, পুনর্বাসন এবং মানসিক চাপকে জয় করে তিনি আবারও ফিরছেন নিজের সবচেয়ে প্রিয় জায়গায়—সবুজ ঘাসের মাঠে। এখন অপেক্ষা শুধু সিএফএলের বাঁশি বাজার, আর মিঠুনের পায়ে আবার গোলের উল্লাস দেখার।




















