Home Science News মঙ্গলের অন্ধকার প্রান্তে নিখোঁজ ‘রত্ন’, ১১ বছর পর ম্যাভেনের সঙ্গে যোগাযোগ হারাল...

মঙ্গলের অন্ধকার প্রান্তে নিখোঁজ ‘রত্ন’, ১১ বছর পর ম্যাভেনের সঙ্গে যোগাযোগ হারাল নাসা

NASA MAVEN Mars Orbiter Silent

মহাকাশে এক অমূল্য ‘সম্পদ’ হারাল নাসা। মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথে টানা ১১ বছর ধরে ঘুরে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করা মার্কিন মহাকাশযান ম্যাভেন (Mars Atmosphere and Volatile Evolution)–এর সঙ্গে আচমকাই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। বহু চেষ্টা সত্ত্বেও এখনও সেই যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারেননি নাসার বিজ্ঞানীরা। লাল গ্রহের পিছন দিক—যে অংশ পৃথিবী থেকে দৃশ্যমান নয়—সেখানে পৌঁছনোর পরই কার্যত নিখোঁজ হয়ে যায় ম্যাভেন।

- Advertisement -

মঙ্গলের বিপরীত প্রান্তে চলে যায় মহাকাশযান

নাসা সূত্রে জানা গিয়েছে, স্বাভাবিক গতিতেই মঙ্গলের কক্ষপথ ধরে এগোচ্ছিল মহাকাশযানটি। এক পর্যায়ে তা মঙ্গলের বিপরীত প্রান্তে চলে যায়, যা সেই সময় সূর্যের আলো থেকে বঞ্চিত থাকায় ছিল সম্পূর্ণ অন্ধকারে ঢাকা। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ৬ ডিসেম্বর ম্যাভেন ফের দৃষ্টিগোচর হওয়ার কথা থাকলেও, তখন থেকেই তার সঙ্গে কোনও রকম যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার পর ৯ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক ভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা স্বীকার করে নেয় নাসা। এখনও পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে, তবে বিজ্ঞানীদের আশা ক্রমশই ক্ষীণ হয়ে আসছে।

   

২০১৩ সালে পৃথিবী থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় ম্যাভেনকে। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সে মঙ্গলের কক্ষপথে পৌঁছয়। তারপর থেকে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডল, উপরিভাগ ও আয়নোস্ফিয়ার নিয়ে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাঠিয়েছে পৃথিবীতে। মঙ্গলের কক্ষপথে নাসা মোট সাতটি অরবিটার পাঠিয়েছিল, ম্যাভেন ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম এবং বৈজ্ঞানিক দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণগুলির একটি।

ম্যাভেনের কোনও যান্ত্রিক ত্রুটির ইঙ্গিত মেলেনি NASA MAVEN Mars Orbiter Silent

সবচেয়ে রহস্যজনক বিষয় হল, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে পর্যন্ত ম্যাভেনের কোনও যান্ত্রিক ত্রুটির ইঙ্গিত মেলেনি। নাসার দাবি, যে মুহূর্তে মহাকাশযানটি মঙ্গলের অন্ধকার প্রান্তে প্রবেশ করে, তখন তার সমস্ত যন্ত্রাংশই স্বাভাবিকভাবে কাজ করছিল। ফলে আচমকা কী এমন ঘটল, যা এই দীর্ঘস্থায়ী যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণ হয়ে দাঁড়াল—তা নিয়েই এখন বিজ্ঞানীদের কৌতূহল তুঙ্গে। তাঁরা নিশ্চিত, মঙ্গলের পিছন দিকের সেই অন্ধকার অঞ্চলে ‘কিছু একটা’ ঘটেছে, তবে ঠিক কী, তা এখনও অজানা।

ম্যাভেনের মূল লক্ষ্য ছিল মঙ্গল গ্রহের উপরের বায়ুমণ্ডল ও আয়নোস্ফিয়ারকে নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করা। সৌরবায়ুর সংস্পর্শে এলে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে, কী ভাবে এক সময়ের জলসমৃদ্ধ গ্রহটি ধীরে ধীরে শুষ্ক ও শীতল হয়ে উঠল—এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিল ম্যাভেন। বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের ধারণা, এক সময় প্রবল ধূলিঝড়ের ফলে মঙ্গলের জলীয় বাষ্প বায়ুমণ্ডলের ঊর্ধ্বস্তরে উঠে গিয়েছিল এবং পরে সৌরবায়ুর প্রভাবে তা ধীরে ধীরে মহাশূন্যে হারিয়ে যায়। এই তত্ত্ব যাচাইয়ে ম্যাভেনের সংগৃহীত তথ্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু অতীত নয়, ভবিষ্যতের মঙ্গল অভিযান পরিকল্পনাও অনেকাংশে ম্যাভেনের তথ্যের উপর নির্ভরশীল ছিল। মানুষের মঙ্গল অভিযানের সম্ভাবনা থেকে শুরু করে সেখানে দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির পরিবেশগত ঝুঁকি—সব ক্ষেত্রেই ম্যাভেনের ডেটা ছিল অপরিহার্য। ফলে এই যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা মঙ্গলকেন্দ্রিক গবেষণায় এক বড়সড় ধাক্কা বলেই মনে করছেন মহাকাশ বিজ্ঞানীরা।

মঙ্গলের ‘পিছন দিক’ নিয়েই কি রহস্য?

মঙ্গলের পিছন দিক বলতে সেই অংশকেই বোঝানো হচ্ছে, যা নির্দিষ্ট সময়ে পৃথিবীর ঠিক উল্টো দিকে অবস্থান করে। মঙ্গল নিজ অক্ষে ঘুরতে ঘুরতে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে, ফলে কোনও একটি দিক চিরকাল পৃথিবীর আড়ালে থাকে না। তবে ম্যাভেন যে অংশে পৌঁছেছিল, সেই সময় তা সূর্যের আলো থেকে বঞ্চিত থাকায় ছিল অন্ধকারে।

মঙ্গলের দু’টি উপগ্রহ—ফোবোস ও ডেমিয়োস। ফোবোস আকারে বড় এবং গ্রহের কাছাকাছি কক্ষপথে ঘোরে, ডেমিয়োস তুলনায় ছোট এবং বাইরের কক্ষপথে অবস্থান করে। পৃথিবীর চাঁদের মতোই এরা মঙ্গলকে একমুখী প্রদক্ষিণ করে, অর্থাৎ একটি দিকই সবসময় মঙ্গলের দিকে মুখ করে থাকে। এই উপগ্রহগুলির কোনও ভূমিকা ম্যাভেনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার নেপথ্যে রয়েছে কি না, তা নিয়েও তদন্ত চলছে।

মহাকাশ বিজ্ঞানের দুনিয়ায় সাময়িক যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা নতুন নয়। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়েও ম্যাভেনের ক্ষেত্রে সেই যোগাযোগ ফিরে না আসায় রহস্য আরও গভীর হচ্ছে। লাল গ্রহের অন্ধকার প্রান্তে ঠিক কী ঘটল—তার উত্তর খুঁজতেই এখন নাসার বিজ্ঞানীরা দিনরাত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

Follow on Google