নয়াদিল্লি: বাংলাদেশে চিনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক, পরিকাঠামোগত এবং সামরিক প্রভাব ভারতের জন্য নতুন করে গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতীয় গোয়েন্দাদের দাবি, ভারতকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলার যে কৌশল বেজিং দীর্ঘদিন ধরে নিয়ে চলেছে, তা এখন আর কেবল তত্ত্বে সীমাবদ্ধ নেই। বরং বঙ্গোপসাগর এবং ভারতের পূর্ব সীমান্তে তা এক ‘সক্রিয় বাস্তবে’ পরিণত হয়েছে, যার ব্যাপক ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব পড়তে চলেছে।
মোংলা বন্দর নিয়ে চিনের ছক
ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হলো, বাংলাদেশের মোংলা বন্দরের ১১০ একরের একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল চিনের সরকারি সংস্থাকে বরাদ্দ করার সিদ্ধান্ত। গোয়েন্দা সূত্রে খবর, ২০১৫ সালের দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী এই জায়গাটি আদতে ভারতের পাওয়ার কথা ছিল। শুধু তাই নয়, মোংলা ও চট্টগ্রাম বন্দরে চিনা পরিকাঠামো এবং বেজিং-সমর্থিত ‘লজিঙ্ক’ (LOGINK) লজিস্টিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের ফলে বঙ্গোপসাগরে বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজ চলাচলের ওপর চিন রিয়েল-টাইম নজরদারি চালাতে পারবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভারতের পূর্ব কমান্ডে নজরদারির ঝুঁকি
গোয়েন্দারা সতর্ক করেছেন যে, বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক নজরদারি ব্যবস্থা (ESM) গড়ে তুলতে পারে চিন। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের সুকনায় অবস্থিত ভারতীয় সেনার ৩৩ নম্বর কোরের রেডিও, মাইক্রোওয়েভ এবং রেডার সিগন্যাল ট্র্যাপ করা চিনের পক্ষে সম্ভব হবে। পাশাপাশি, কলকাতা বা বিশাখাপত্তনম থেকে রওনা হওয়া ভারতীয় নৌসেনার জাহাজগুলির গতিবিধির ওপরও চিন বঙ্গোপসাগরে একটানা নজরদারি চালাতে পারবে, যা নৌবাহিনীর গোপনীয়তা এবং স্বাধীন চলাচলের ক্ষেত্রে বড়সড় বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
উদ্বেগ বাড়াচ্ছে তিস্তা প্রকল্পও
তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চিনা বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতি ভারতের রক্তচাপ আরও বাড়িয়েছে। শিলিগুড়ি করিডোর বা ভারতের ‘চিকেনস নেক’-এর এত কাছে চিনা প্রযুক্তিবিদ ও হাইড্রোলজিস্টদের উপস্থিতি বেজিংকে ভারতের অত্যন্ত স্পর্শকাতর এলাকায় গুপ্তচরবৃত্তির সুযোগ করে দিতে পারে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
বৃহত্তর আঞ্চলিক কৌশল ও সামরিক আঁতাত
গোয়েন্দাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত চিন-মায়ানমার-বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডরের মাধ্যমে এই অঞ্চলে লজিস্টিক নেটওয়ার্ক তৈরি করতে চাইছে বেজিং। পাকিস্তানের গদর এবং মায়ানমারের চাউকপিউ বন্দরের পর এবার বাংলাদেশের মোংলাকে ব্যবহার করে ভারতকে সম্পূর্ণভাবে ঘিরে ফেলার ছক কষছে তারা। এর পাশাপাশি, ঢাকা ও বেজিংয়ের মধ্যে সামরিক সহযোগিতাও বাড়ছে। পাকিস্তানকে দেওয়া চিনা যুদ্ধবিমান জে-১০সিই (J-10CE) বাংলাদেশে বিক্রির বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে খবর। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক বড়সড় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে।



