কার্শিয়াং: উত্তরবঙ্গ বরাবরই দু’হাত ভরিয়ে দিয়েছে বিজেপিকে। এবার সেই ভালোবাসার ‘ঋণ’ শোধ করার পালা। মঙ্গলবার কার্শিয়াংয়ের মন্টেভিট গ্রাউন্ডের মেগা জনসভা থেকে পাহাড়বাসীকে ঠিক এই বার্তাই দিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এদিন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কড়া ভাষায় আক্রমণ করার পাশাপাশি, পাহাড়ের সার্বিক উন্নয়নের জন্য একগুচ্ছ বড় ঘোষণাও করেন তিনি। (Shuvendu Adhikari Kurseong Rally)
‘আমি ঘুরতে আসিনি, কাজের জন্য আসব’
মঙ্গলবার সকালে বাগডোগরা বিমানবন্দরে নেমে সড়কপথে কার্শিয়াং পৌঁছন মুখ্যমন্ত্রী। মাসখানেক আগে শিলিগুড়িতে এলেও, ক্ষমতায় আসার পর পাহাড়ের মাটিতে এটিই তাঁর প্রথম জনসভা। মন্টেভিট গ্রাউন্ডের উপচে পড়া ভিড়কে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, “২০০৯ সাল থেকে বারবার পাহাড়ে পদ্ম ফুটেছে। পাহাড়বাসী সবসময় বিজেপির ওপর ভরসা রেখেছে। এবার সেই প্রত্যাশা পূরণের সময় এসেছে।” প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে নিশানা করে শুভেন্দুর তীক্ষ্ণ কটাক্ষ, “আগের মুখ্যমন্ত্রী এখানে ঘুরতে আসতেন। আপনাদের ভাই শুভেন্দু পাহাড়ে ঘুরতে আসবে না। আমি আসব শুধু উন্নয়ন এবং কাজের জন্য।”
চা-শ্রমিকদের জন্য বড় পদক্ষেপ
পাহাড়ের অর্থনীতির অন্যতম মেরুদণ্ড চা-বাগানগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করতে এদিন বড় পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি অভিযোগ করেন, আগের তৃণমূল সরকারের দুর্নীতির কারণেই ২০২১ সালে প্রধানমন্ত্রীর চালু করা ‘পিএম চা-শ্রমিক যোজনা’ বাস্তবায়িত হয়নি। চা-শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, বন্ধ থাকা ২৫টি চা-বাগানের জন্য ৩৩৪ কোটি টাকার উন্নয়নমূলক কাজ দ্রুত শুরু হচ্ছে। টি-বোর্ডের চেয়ারম্যানকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পাহাড়ের সমস্ত বন্ধ চা-বাগান দ্রুত খুলে দেওয়া হবে।
জিটিএ দুর্নীতি নিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি
আগের সরকারের আমলে গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (GTA)-এ ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, “আগের সরকারের আমলে তোলাবাজি, কাটমানি ছাড়া আর কিছুই হয়নি। জিটিএ-তে যারা দুর্নীতি করেছে, তাদের জেলে ভরা হবে। লুটেরাদের কাউকেই ছাড়া হবে না।” পাশাপাশি, গোর্খাদের বিরুদ্ধে আগের সরকারের দেওয়া সমস্ত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হবে এবং পুলিশে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে নিয়োগ হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
উন্নয়নের ডবল ইঞ্জিন ও নয়া পরিকাঠামো
পাহাড়ে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের সুবিধা কীভাবে পৌঁছবে, তার একটি রোডম্যাপ তুলে ধরেন শুভেন্দু। নির্বাচনী ইস্তাহার পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ক্রীড়া পরিকাঠামো উন্নয়নে বড় ঘোষণা করেন৷ তিনি জনান, কালিম্পঙে নতুন মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন, কার্শিয়াং মহকুমা হাসপাতালের আধুনিকীকরণ ও সংস্কার।. সরকারি স্কুলগুলিতে অত্যাধুনিক ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’ তৈরি। কেন্দ্রের ‘খেলো ইন্ডিয়া’ প্রকল্পের আওতায় ইন্ডোর স্টেডিয়াম ও স্পোর্টস গ্রাউন্ড নির্মাণ।
এদিনের এই হাই-প্রোফাইল জনসভায় রাজনৈতিক ঐক্যের এক অনন্য ছবি ধরা পড়ে। উপস্থিত ছিলেন উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিশাল লামা, অর্থ প্রতিমন্ত্রী আনন্দময় বর্মণ, সাংসদ রাজু বিস্তা, হর্ষবর্ধন শ্রিংলা এবং পাহাড়ের অন্যান্য বিধায়করা। এছাড়াও গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সভাপতি বিমল গুরুং, সাধারণ সম্পাদক রোশন গিরি এবং জিএনএলএফ সভাপতি মন ঘিসিং-এর উপস্থিতি প্রমাণ করে দিল, পাহাড়ের রাজনীতিতে নতুন সরকারের সঙ্গে এক মজবুত সমীকরণ তৈরি হতে চলেছে।



