ওয়াশিংটন/তেহরান: টানা তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরুর লক্ষ্যে একটি যুগান্তকারী প্রাথমিক শান্তি চুক্তিতে পৌঁছল আমেরিকা এবং ইরান। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই চুক্তির রূপরেখা চূড়ান্ত হয়েছে, যা আগামী ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের শীর্ষ আধিকারিকরাও এই খবরের সত্যতা স্বীকার করে নিয়েছেন।
যদিও এই সমঝোতা স্মারকের (MoU) সম্পূর্ণ বয়ান এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে সংবাদসংস্থা ‘মেহের নিউজ এজেন্সি’ দাবি করেছে যে তারা এই চুক্তির ১৪ দফার খসড়া হাতে পেয়েছে। ইরানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত অনুমোদনের পরই এটি বাস্তবায়িত হবে। (US Iran peace deal brokered by Pakistan and reopening of Strait of Hormuz)
চুক্তির কেন্দ্রে যুদ্ধবিরতি এবং অবরোধ প্রত্যাহার
খসড়া চুক্তির প্রথম শর্তেই লেবানন-সহ সমস্ত ফ্রন্টে “স্থায়ী এবং অবিলম্বে” যুদ্ধবিরতির কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি, ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং তাদের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আমেরিকা। আগামী ৩০ দিনের মধ্যে মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে এই চুক্তিতে।
উল্লেখ্য, গত তিন মাসের এই ভয়াবহ যুদ্ধে ইরান ও লেবাননে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ করে দেওয়ায় এবং জবাবে আমেরিকা ইরানের বন্দরগুলো ব্লক করে দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিয়েছিল।
কী রয়েছে আমেরিকা-ইরান ১৪ দফার চুক্তিতে?
মেহের নিউজ এজেন্সির রিপোর্ট অনুযায়ী, খসড়া চুক্তির মূল বিষয়গুলি হল-
১. লেবানন-সহ সমস্ত ফ্রন্টে অবিলম্বে ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি।
২. ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমেরিকার হস্তক্ষেপ না করা এবং সার্বভৌমত্বকে সম্মান।
৩. আগামী ৩০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার।
৪. ইরানের চারপাশ থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি।
৫. ইরানের ব্যবস্থাপনায় ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া।
৬. ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল বিক্রির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা এবং আর্থিক সংস্থানগুলোর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়া।
৭. আমেরিকা ও তার মিত্রদের তরফে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন পরিকল্পনা উপস্থাপন।
৮. পারমাণবিক ইস্যু এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছতে ৬০ দিনের আলোচনা পর্ব।
৯. পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে ‘এনপিটি’ (NPT) চুক্তির প্রতি ইরানের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা।
১০. আলোচনা চলাকালীন ওই অঞ্চলে নতুন করে মার্কিন সেনা মোতায়েন বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করা।
১১. ৬০ দিনের আলোচনার মধ্যে ইরানের আটকে থাকা ২৪ বিলিয়ন ডলারের তহবিল মুক্ত করা, যার অর্ধেক (১২ বিলিয়ন ডলার) আলোচনার আগেই দিয়ে দেওয়া হবে।
১২. চুক্তির শর্ত ঠিকমতো মানা হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য বিশেষ নজরদারি মেকানিজম তৈরি।
১৩. রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের (UNSC) প্রস্তাবের মাধ্যমে চূড়ান্ত চুক্তির অনুমোদন।
১৪. আটকে থাকা তহবিলের অর্ধেক মুক্তি এবং অবরোধ প্রত্যাহারের পরেই চূড়ান্ত আলোচনা শুরু হবে। এই আলোচনায় শুধুমাত্র পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠন নিয়ে কথা হবে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থনের বিষয়টি এজেন্ডার বাইরে থাকবে।
পারমাণবিক ইস্যু ও অবশিষ্ট চ্যালেঞ্জ
খসড়া চুক্তিতে মূলত অর্থনৈতিক স্বস্তির ওপরই সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মতো সবচেয়ে বিতর্কিত পারমাণবিক বিষয়গুলো ভবিষ্যতের ৬০ দিনের আলোচনার জন্য তুলে রাখা হয়েছে।
এই ঐতিহাসিক চুক্তির খসড়া তৈরি হলেও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ এখনও রয়ে গিয়েছে। রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, লেবাননে ইসরায়েল এবং ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লার মধ্যে লড়াই এই আলোচনাকে বেশ জটিল করে তুলেছিল। ইসরায়েল ইতিমধ্যেই স্পষ্ট জানিয়েছে যে তারা আমেরিকা-ইরান আলোচনার কোনও পক্ষ নয়। এই চুক্তির বিষয়ে তেল আভিভ এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও মন্তব্য করেনি।





